সাক্ষাৎকার - ড. ইফতেখারুজ্জামান

সুশাসনের অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক

Published: 09 August 2026

পাঁচ মাস ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদ খালি। ফলে একরকম স্থবির হয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটির মূল কার্যক্রম। সংস্থাটির বর্তমান নেতৃত্বহীন অবস্থা, এর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব মমতাজী

বাংলাদেশ প্রতিদিন : বর্তমানে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার না থাকায় সংস্থার কার্যক্রমে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : দুদকের আইন অনুযায়ী, কমিশন (চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার) না থাকলে রুটিন প্রশাসনিক বিষয় ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে না। ফলে নতুন কোনো অনুসন্ধান, তদন্ত কিংবা মামলা দায়েরের মতো মৌলিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। আইন অনুযায়ী পদ খালি হওয়ার সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এত দীর্ঘ সময় দুদক পদশূন্য অবস্থায় ছিল, এমন নজির নেই। এর ফলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদক যেমন প্রায় পাঁচ মাস কার্যত স্থবির হয়ে আছে, তেমন এটি কার্যকর রাখতে সরকার আদৌ আগ্রহী কি না-জনমনে সে প্রশ্নও উঠছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : দুদকের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন নেতৃত্বশূন্য থাকা সুশাসনের জন্য উদ্বেগ মনে করছেন, এতে ঝুঁকি কোথায় মনে হচ্ছে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : মনে রাখতে হবে, দুদক একা দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না, অন্য কোনো দেশেও তা হয় না। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ, সরকার, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে যৌথভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু দুর্নীতি প্রতিরোধের কেন্দ্রীয় ও নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনি প্রতিষ্ঠান হলো দুদক। সেই প্রতিষ্ঠানটি যখন দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকে, তখন সুশাসনের মূল ভিত্তিটাই ধসে পড়ে। যে সরকার জুলাই সনদের রক্তক্ষরণ ও জন আকাক্সক্ষা ধারণ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের আমলে প্রায় পাঁচ মাস দুদক অকার্যকর এবং থেকেও বাস্তবে না থাকাটা অস্বাভাবিক ও সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের বিব্রতকর দৃষ্টান্ত। এতে দুর্নীতিবাজেরা উৎসাহিত হচ্ছে, অভিযুক্ত বা মামলার আসামিরা অতিরিক্ত সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনার নেতৃত্বাধীন দুদক সংস্কার কমিশন যে সুপারিশগুলো করেছিল, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে কি এ সংকট কাটানো সম্ভব হতো?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল (যার মধ্যে বর্তমান সরকারি দল ও সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো রয়েছে) সবাই প্রায় শতভাগ নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছিল। তৎকালীন দুদকও এর সঙ্গে একমত হয়েছিল। সেখানে দুই ধরনের সুপারিশ ছিল-কিছু সরাসরি দুদকের নিজস্ব সংস্কার সম্পর্কিত এবং কিছু সার্বিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত-এগুলো বাস্তবায়িত হলে দুদকের অকার্যকরতা দূর হয়ে একে একটি গতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যেত। আমলাতন্ত্রের মধ্যে কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের বাধায় দুদক অধ্যাদেশ-২০২৫ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংস্কার কমিশনের অনেক মৌলিক প্রস্তাব বাতিলের খাতায় চলে গেছে। তেমন এ একই আমলাতান্ত্রিক অপশক্তির যোগসাজশে নির্বাচিত সরকারও দুদক সংস্কার দূরে থাক, প্রায় পাঁচ মাস দুদককে নেতৃত্বহীন রেখেছে বলে আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : বাংলাদেশে অতীতে কি এমন কোনো নজির রয়েছে, যেখানে নেতৃত্বসংকটের কারণে দুর্নীতি তদন্ত বা মামলার গতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : এত দীর্ঘ সময় দুদকের নেতৃত্বশূন্য থাকার কোনো নজির এর জন্মলগ্ন থেকে নেই। এটি একদমই নজিরবিহীন। তবে নেতৃত্বের দুর্বলতার প্রভাব অতীতেও কাজের গতিতে পড়েছে। দুদক কাগজে কলমে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠিত হলেও এর প্রতিষ্ঠার পেছনে যে ভিশন ও প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে তা শুরু থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে একদিকে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে আমলাতন্ত্র এবং তার সঙ্গে প্রেষণে আসা সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভাবেই দুদক তার কাক্সিক্ষত গতি ও নিরপেক্ষতা কখনো অর্জন করতে পারেনি।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের বর্তমান প্রক্রিয়ায় কী ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : ২০০৪ সালের আইনে নিয়োগের জন্য যে ‘সার্চ কমিটি’র কথা বলা ছিল, তাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব আমরা দিয়েছিলাম। প্রথমত আমরা এমন একটি সার্চ কমিটির কথা বলেছি যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। দ্বিতীয়ত নিয়োগপ্রক্রিয়াটি হতে হবে উন্মুক্ত। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আবেদন আহ্বান করা হবে, প্রার্থীদের নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে বাছাই (শর্টলিস্ট) করা হবে এবং তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। প্রার্থী দুদকের জন্য কী ভিশন রাখেন, তা পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে কমিটির বাইরে বিশেষজ্ঞ দিয়ে সংশ্লিষ্ট কারিগরি দক্ষতা যাচাই করা যেতে পারে। চূড়ান্ত বাছাইকৃত তালিকাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করে জনগণের কাছ থেকে মতামত (ফিডব্যাক) নেওয়া হবে। তারপর রাষ্ট্রপতির কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ পাঠানো হবে। এতে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে। এ প্রস্তাবে সব রাজনৈতিক দলের সম্পূর্ণ সম্মতি ছিল।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : একটি অভিযোগ প্রায়ই ওঠে যে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলায় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না দুদক। বর্তমান এই নেতৃত্বশূন্যতা কি সেই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : অবশ্যই। সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা রয়েছে যে দুদক ক্ষমতাসীনদের সুরক্ষা দেয় আর বিরোধীদের ঘায়েল করে। দুদকের বিগত দিনের সংস্কৃতিই এমন ছিল। এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের নেতৃত্বশূন্যতা প্রতিষ্ঠানটির ওপর মানুষের আস্থা আরও কমিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : নেতৃত্বহীন এই সময়ে চলমান তদন্ত, অনুসন্ধান, মামলা পরিচালনা এবং নতুন অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী, নতুন কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করা, কারও বিরুদ্ধে তদন্ত অনুমোদন দেওয়া কিংবা আদালতে চার্জশিট পেশ বা মামলা করার ক্ষেত্রে তিন সদস্যের কমিশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কমিশন না থাকা মানে এ আইনি প্রক্রিয়াগুলো পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়া। নতুন জমা হওয়া হাজার হাজার অভিযোগ কেবল ফাইলবন্দি হয়ে থাকবে। সাধারণ মানুষ এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি টের পাবে, তারা দুর্নীতির প্রতিকার পাবে না।

অন্যদিকে যারা ইতোমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত, তারা মামলা ঝুলে থাকার সুবাদে বিচার থেকে ছাড় বা অতিরিক্ত সময় পেয়ে যাওয়ার অযাচিত সুযোগসুবিধা পাবে, যা জনমনে চরম হতাশা তৈরি করবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : দুদক সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান : রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নীতিগত ঐক্য থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ এবং সরকারের অভ্যন্তরে থাকা কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের বাধার কারণে সুপারিশ বাস্তবায়নের পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে পড়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করা। সংস্কার কমিশন যে ৪৭টি সুপারিশ এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য যেসব ‘আশু করণীয়’ হিসেবে প্রস্তাব করেছে, সেগুলো দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এর প্রায় সবই দুদকের নিজস্ব উদ্যোগে বাস্তবায়ন সম্ভব। শুধু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা লাগবে। সদিচ্ছার অভাব থাকলে কোনো সংস্কারই কাগজে কলমের বাইরে বের হতে পারবে না।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আন্তর্জাতিকভাবে সফল দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ কী শিক্ষা নিতে পারে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : এসব দেশের সাফল্য বিশ্লেষণ করলে তিনটি প্রধান বিষয় পাওয়া যায়। প্রথমত সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে ‘শূন্য সহনশীলতা’র প্রকৃত বাস্তবায়ন, কারও প্রতি ভয় বা করুণার ঊর্ধ্বে থেকে। দ্বিতীয়ত সংস্থাকে রাজনৈতিক ও প্রেষণে আসা আমলাদের মাধ্যমে এবং সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা এবং তৃতীয়ত উন্মুক্ত ও স্বাধীন বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন সাপেক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত সক্ষমতা এবং সর্বোপরি জনবলের সততা ও শুদ্ধতা। হংকং বা ইন্দোনেশিয়ায় স্বাধীন তদারকি পর্ষদ থাকে, যা প্রতিষ্ঠানের সার্বিক জবাবদিহি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে নেতৃত্ব বাছাই এবং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতাসমৃদ্ধ একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করাতে পারে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনি যদি সরকারকে তিনটি জরুরি পরামর্শ দিতে চান, সেগুলো কী হবে?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : আমার তিনটি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ থাকবে-স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত নিয়োগ, আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমানো এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : এই সময়ের মধ্যে দুদকের নেতৃত্ব নির্বাচন করতে না পারার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন?

ড. ইফতেখারুজ্জামান : এর ভালো ব্যাখ্যা সরকারই দিতে পারবে। তবে আমার পর্যবেক্ষণে মূল কারণ দুটি। আমলাতান্ত্রিক কায়েমি স্বার্থ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিপ্রসূত দীর্ঘসূত্রতা। নিরপেক্ষ, দক্ষ ও সৎসাহসী চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নেতৃত্বের হাতে দুদক থাকলে সরকারি আমলাতন্ত্র ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল এবং তাদের নেতা-কর্মীসহ বিভিন্ন খাতের দোসর বা সহযোগীদের দুর্নীতির জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। এমন একটি ভয় তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত বা দুর্নীতিসহায়ক অংশের মধ্যে সব সময় কাজ করে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন : আপনাকে ধন্যবাদ।

ড. ইফতেখারুজ্জামান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

ড. ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি

বাংলাদেশ প্রতিদিন
আগস্ট ০৯, ২০২৬
লিংক