সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
ঢাকা, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: কতৃত্ববাদ পতন পরবর্তী দেড় বছরে রাষ্ট্রসংস্কারের যে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে, তা মজুবত হয়নি; বরং অর্জনের তুলনায় ঘাটতি অনেক বেশি বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে একটি সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠায় ভিত্তি স্থাপনেও এই সময়ে ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি সংস্কারের নামে গৃহীত উদ্যোগ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই বাস্তবে লক্ষ্যভ্রষ্ট এবং প্রত্যাশা পূরণে ক্ষেত্রবিশেষে উল্টো যাত্রার ঘটনা ঘটেছে। তা ছাড়া, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অংশ হিসেবে নতুন ও পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত, জনগণের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার জন-আকাক্সক্ষা থাকলেও এই প্রত্যাশা পূরণের কোনো দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। সর্বোপরি রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি। ‘‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি” শীর্ষক পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উল্লিখিত মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
আজ টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। প্রতিবেদনটি যৌথভাবে উপস্থাপন করেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম ও মো. জুলকারনাইন।
টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বহুবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সময়ে বিচার, সংস্কার, নির্বাচন, রাষ্ট্র পরিচালনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত গৃহীত এবং রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তবে এ অবকাঠামো পর্যাপ্ত শক্তিশালী না হওয়ায় তিনটি ক্ষেত্রেই বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কারের ভিত্তি যতটুকু মজবুত হতে পারতো ততটুকু হয়নি। রাষ্ট্র সংস্কারের বেশ কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ঐকমত্যে পৌঁছানো একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও মূলমন্ত্র তথা জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার অভীষ্টের জন্য অপরিহার্য বিধান সম্পর্কে জুলাই সনদে ঐকমত্যের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের প্রতিরোধের ফলে সংস্কারের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। পরবর্তীতে অধ্যাদেশ ও সরকারি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রতিরোধক মহল, বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকারের ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি, আশু বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারে অগ্রগতি অর্জনে সরকারের ব্যর্থতা এবং জুলাই সনদের আওতার বাইরে সংস্কার কমিশনসমূহের সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিলো না। তা ছাড়া, সংস্কার প্রতিরোধক ঝুঁকি বিশ্লেষণে আগ্রহ না থাকার কারণে প্রতিরোধক শক্তির হাতে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত বিভিন্ন অধ্যাদেশে মৌলিক দুর্বলতার ওপর আলোকপাত করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। যার অন্যতম কারণ সংস্কারবিমুখ আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের আত্মসমর্পণ। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নামে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপসারণের মাধ্যমে দলীয়করণমুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিন্তু প্রকৃত অর্থে একটি দলের একচেটিয়া প্রভাবের পরিবর্তে পতিত সরকারের সুবিধাভোগীদের একাংশ এবং বর্তমানে সক্রিয় দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট --- এই ত্রিপক্ষীয় প্রভাব আমলাতন্ত্রে বিরাজ করছে। সার্বিকভাবে সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াতে অ্যাডহক ও “পিক অ্যান্ড চুজ” প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে অন্যদিকে সিদ্ধান্তহীনতা বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তার অভাব প্রবল। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে যার কারণে জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।’
অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই সংস্কারের ভিত্তি স্থাপনের দায়িত্বকে শুধু প্রত্যাশা হিসেবেই বিবেচনা করেছে, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতি ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং নিরসনের উপায় অনুসন্ধান করেনি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সরকারের এখতিয়ারভুক্ত আশু করণীয় প্রস্তাবনা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে পারেনি, যেগুলো হয়েছে তা লোকদেখানো। জুলাই সনদ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে প্রতিফলিত হয়েছে। বিচার ব্যবস্থার সংস্কারে প্রশংসনীয় অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং প্রক্রিয়াগত দুর্বলতার পাশাপাশি বিচার এবং প্রতিশোধ একাকার হয়ে গেছে। যার ফলে একদিকে যেমন ঢালাওভাবে অভিযুক্তদের ন্যায়বিচারের অধিকার খর্ব হচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীদের জবাবদিহির সম্ভাবনা ক্ষীণ হচ্ছে।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, ‘নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্তের অভীষ্ট অর্জনে অগ্রগতির তুলনায় ঘাটতির পাল্লাই বেশি ভারী। সংস্কারের অধিকাংশ মৌলিক খাতে বিশেষ করে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিতে প্রস্তাবিত সুপারিশের ক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় প্রতিকূল অবস্থানের কারণে জুলাই সনদ দুর্বল হয়েছে এবং বাস্তবায়ন ঝুঁকিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যম কমী ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গত দেড় বছরের চিত্রকে গভীর হতাশাব্যঞ্জক অভিহিত করে ড. জামান বলেন, ‘গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা আগের চেয়ে অনেক বেশি চাপের মুখে পড়েছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের বাইরেও অরাষ্ট্রীয় চাপের মুখোমুখি হয়েছে। যা প্রতিহত করতে সরকার যথাসময়ে পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে, এমনকি গণমাধ্যম স্বাধীনতা-পরিপন্থী শক্তিকে জবাবদিহিহীনতা দিয়েছে। পাশাপাশি, নারী অধিকার এবং ধর্মীয়, জাতিগত, লৈঙ্গিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উর্ধ্বে সকল নাগরিকের সমান অধিকার এবং সহাবস্থান নিশ্চিতের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে নারী কমিশনের প্রতিবেদনের সাথে সরকারের সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে অস্বীকার করে সরকার প্রতিবেদনটি অবমূল্যায়ন করেছে এবং যারা নারী ক্ষমতায়নের বিরোধী শক্তি তাদের অতিক্ষমতায়িত করেছে ।’
কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমল এবং জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার ক্ষেত্রে ঘাটতি বিদ্যমান ছিলো। এ ছাড়া, নির্বাচন বিষয়ে দেখা গেছে, বিভিন্ন অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা সত্ত্বেও নির্বাচনী কার্যক্রম চলমান ছিলো, তবে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে, একদিকে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রধানত উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অপসারণের মাধ্যমে দলীয়করণ থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা থাকলেও, একদলের স্থলে অপর দলীয়করণ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে কার্যত দলীয়করণের ধারাও অব্যাহত ছিলো। পুলিশ-প্রশাসনসহ অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অস্থিরতা, নতুন রাজনৈতিক বলয় তৈরির প্রয়াস এবং ব্যাপক রদ-বদলের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকরতা এবং এক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। এ ছাড়া, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ্যাড-হক প্রবণতা; প্রশাসন পরিচালনায় অনেক ক্ষেত্রে সরকারের দৃঢ়তা ও কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি; সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বশীলদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা; কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিবর্তন করার মতো ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়নি। সরকারি দপ্তরসমূহে তথ্য গোপন করার প্রবণতা ছিলো। অবাধ তথ্য প্রবাহ ও জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের চর্চা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা সত্ত্বেও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপনে ব্যর্থতা লক্ষ করা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিকাশ ও প্রভাব দৃশ্যমান ছিলো, অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের কারণে জেন্ডার, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে ছিলো, যা বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সকলের সমান অধিকার, সকলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতা ছিলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা বা তোষণমূলক অবস্থানের কারণে ধর্মান্ধদের ক্ষমতায়ন হয়েছে। নাগরিক সমাজের ভূমিকা ইস্যুতে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমে নাগরিক সমাজকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তাদের অগ্রাহ্য করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে। বিভিন্ন সংস্কারে নাগরিক সমাজের সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের মধ্যে নাগরিক সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ থাকলেও প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে নাগরিক সমাজ সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মধ্যে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি। এছড়া, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দৃশ্যমান ব্যর্থতা ছিল। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা এখন রাষ্ট্রের পাশাপাশি অতিক্ষমতায়িত অরাষ্ট্রীয় শক্তির হাতে জিম্মি হয়েছে। অন্যদিকে গণমাধ্যমের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ শত্রুর অস্তিত্ব বিদ্যমান।
গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org