প্রকাশকাল: ২৯ অক্টোবর ২০২৬
জেলা পর্যায়ে কাজ করা একজন সাংবাদিক যখন স্থানীয় কোনো প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন প্রায়ই তাঁকে নানা চাপের মুখে পড়তে হয়। কখনো প্রভাবশালী কারও ফোন আসে, কখনো স্থানীয় নেতার কাছ থেকে আসে সতর্কবার্তা, আবার কখনো অনেক পরিশ্রমে তৈরি প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশই হয় না। রংপুর বিভাগের অনেক সাংবাদিক এমন চাপ সামলেই প্রতিদিন কাজ করেন, যদিও পেশাগত সুরক্ষার আইনি নিশ্চয়তা তাঁদের নেই বললেই চলে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই অঞ্চলের টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রায় ৪০ জন সাংবাদিককে নিয়ে এক দিনের একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল, নিজের নিরাপত্তা বজায় রেখে কীভাবে আরও গভীরে অনুসন্ধান করা যায় এবং তথ্য-প্রমাণের শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিবেদন দাঁড় করানো যায়, সে বিষয়ে তাঁদের দক্ষতা বাড়ানো।
গত ২৪ অক্টোবর রংপুরের আরডিআরএস সম্মেলনকক্ষে প্রশিক্ষণের সূচনা করেন দেশের খ্যাতিমান অনুসন্ধানী সাংবাদিক মো. বদরুদ্দোজা বাবু। শুরুতেই তিনি অংশগ্রহণকারীদের সামনে একটি কাল্পনিক ঘটনা তুলে ধরেন, যা জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের কাছে মোটেই অপরিচিত নয়। একটি সরকারি খাদ্যগুদামে আগুন লেগেছে, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে পাঁচ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য পুড়ে গেছে, আর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছে কর্মকর্তাদের দুঃখপ্রকাশের খবর। এরপর তিনি ঘটনায় আরও দুটি তথ্য যোগ করেন। আগুন লেগেছিল গুদামের একটি বড় নিরীক্ষার ঠিক দুই দিন আগে, আর আশপাশের বাসিন্দারা কয়েক মাস ধরে গভীর রাতে গুদাম থেকে ভারী যানবাহন বেরিয়ে যেতে দেখেছেন।
এই দুটি তথ্য সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি আগুন লাগার অনেক আগেই গুদাম থেকে খাদ্যশস্য সরিয়ে ফেলা হয়েছিল? কিন্তু সন্দেহ যত জোরালোই হোক, তা প্রমাণ নয়। তা ছাড়া স্টক রেজিস্টারে কেবল লেখা থাকে গুদামে কী পরিমাণ পণ্য থাকার কথা, বাস্তবে কতটুকু আছে তা সেখানে ধরা পড়ে না। ফলে সাংবাদিকদের সামনে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়, আগুন লাগার সময় গুদামে যে খাদ্যশস্য ছিল না, সেটি তাঁরা প্রমাণ করবেন কীভাবে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া হয় দশ মিনিট সময় আর একটি খাতা, সঙ্গে একটি শর্ত, কেউ চুপ করে থাকতে পারবেন না। অল্পক্ষণেই আলোচনা জমে ওঠে। কাছের বাজারে সরকারি সিলমোহর দেওয়া বস্তা পাওয়া গেলে তা প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি নিছক কাকতালীয় ঘটনা, তা নিয়ে তর্ক চলে। গভীর রাতে ট্রাক চলাচলের হিসাব মেলাতে সিসিটিভি ফুটেজ কতটা কাজে আসতে পারে, সে প্রসঙ্গও ওঠে। নৈশপ্রহরী ও শ্রমিকদের বক্তব্য আর কর্তৃপক্ষের অস্বীকারের মধ্যে কোনটির গুরুত্ব কতখানি, তা-ও যাচাই করে দেখেন তাঁরা। একপর্যায়ে একজন জানতে চান, গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কি কখনো এ কথা স্বীকার করবেন? তখন সবাই একমত হন যে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি থাকবে।
আলোচনার সূত্র ধরে মো. বদরুদ্দোজা বাবু বলেন, অনিয়ম তুলে ধরাই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার শেষ কথা নয়। ব্যবস্থাটি কেন ভেঙে পড়ল এবং যাঁদের তদারকির দায়িত্ব ছিল, তাঁরা কেন বিষয়টি টের পেলেন না, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে বের করতে হয়। অনুশীলনের শেষে অংশগ্রহণকারীরা মিলে একটি অনুসন্ধান পরিকল্পনা দাঁড় করান। তাতে স্টক রেজিস্টার যাচাই, পরিবহন পাসের তথ্য মিলিয়ে দেখা, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থার খোঁজখবর নেওয়ার মতো ধাপগুলো যুক্ত হয়। এই অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সাধারণ সংবাদ আর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পার্থক্য তাঁদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের পর পরের অধিবেশনে আলোচনা গড়ায় ডেটা বা উপাত্ত বিশ্লেষণে। টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ব্যাখ্যা করেন, জনস্বার্থে নজরদারির কাজে কেন ডেটা আজ এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, ডিজিটাল নথিপত্র বিশ্লেষণ করতে পারলে প্রতিটি তথ্যের জন্য ঝুঁকি নিয়ে মাঠে যেতে হয় না, বরং দপ্তরে বসেই অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম খুঁটিয়ে দেখা যায়। বিভিন্ন জেলার স্থানীয় সরকারি প্রকল্পের তথ্য চিত্রের মাধ্যমে দেখিয়ে তিনি বোঝান, একটি নথি বা কর্মকর্তার একটি বক্তব্যে যে গরমিল চোখে পড়ে না, অনেক সংখ্যা পাশাপাশি রাখলে তা স্পষ্ট হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত তথ্য এবং ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) পোর্টালের কথা তুলে ধরেন, যেখানে সরকারি দরপত্র ও কেনাকাটার তথ্য প্রকাশ করা হয়। তিনি দেখান, ক্রয়-সংক্রান্ত দুর্নীতির অনেক কিছুই ঘটে প্রকাশ্যে। যেমন, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়াতে এবং ব্যয়ের নির্ধারিত সীমার নিচে থাকতে বড় উন্নয়ন প্রকল্পকে ভেঙে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কৌশল জানা থাকলে একজন সাংবাদিক দপ্তরে বসেই সরকারি অর্থ ব্যয়ের খুঁটিনাটি পরীক্ষা করতে পারেন।
এরপর টিআইবির সহকারী সমন্বয়ক রিফাত রহমান ডেটা বিশ্লেষণের বিভিন্ন সফটওয়্যার, ড্যাশবোর্ড ও ভিজ্যুয়ালাইজেশন পদ্ধতি নিয়ে অনুশীলন করান, যার মাধ্যমে জটিল পরিসংখ্যানকে সহজবোধ্য চিত্রে রূপ দেওয়া যায়। এসব অধিবেশন থেকে সাংবাদিকেরা বুঝতে পারেন, দপ্তরে বসে গবেষণা করলে মাঠপর্যায়ের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন তৈরি করা সহজ হয়।
প্রশিক্ষণের শেষ ভাগে আলোচনায় উঠে আসে সাংবাদিকদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, গণমাধ্যমের মালিকপক্ষের প্রভাব এবং আইনি সুরক্ষার অভাব নিয়ে তাঁরা খোলামেলা কথা বলেন। তাঁদের উদ্বেগের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ তাঁর পেশাদারিত্ব ও তথ্যের নির্ভুলতা। প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা, গণমাধ্যমের মালিকানায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি আশ্বাস দেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো সাংবাদিক ঝুঁকির মুখে পড়লে টিআইবি তাঁর পাশে থাকবে।
দিনশেষে ড. ইফতেখারুজ্জামান অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের হাতে সনদ তুলে দেন। সারা দিনের অনুশীলন, ডেটা নিয়ে কাজ আর জেলা পর্যায়ের সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে খোলামেলা আলোচনার স্বীকৃতি এই সনদ। তবে প্রশিক্ষণের প্রকৃত সাফল্য বোঝা যাবে আগামী দিনগুলোতে, যখন তাঁদের লেখায় উঠে আসবে তথ্য-প্রমাণে সমৃদ্ধ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
এক দিনের এই আয়োজন থেকে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের প্রাপ্তি ছিল বেশ কয়েকটি। খাদ্যগুদামের কাল্পনিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁরা নিজেরাই একটি অনুসন্ধান পরিকল্পনা তৈরি করেছেন, যেখানে সন্দেহকে প্রমাণে রূপ দিতে কোন নথি যাচাই করতে হবে, কোন সূত্রের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যকে কীভাবে নথি দিয়ে সমর্থন করতে হবে, তা ধাপে ধাপে সাজানো হয়েছে। ই-জিপি পোর্টাল থেকে সরকারি ক্রয়ের তথ্য খুঁজে বের করা এবং ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনিয়মের ধরন চিহ্নিত করার পদ্ধতির সঙ্গেও তাঁরা পরিচিত হয়েছেন, যা মাঠে বাড়তি ঝুঁকি না নিয়েই প্রতিবেদনের ভিত্তি তৈরিতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা ও পেশাগত চাপ নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ পেয়েছেন তাঁরা, পেয়েছেন টিআইবির পক্ষ থেকে পাশে থাকার আশ্বাসও। রংপুর অঞ্চলে প্রমাণনির্ভর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চর্চা এগিয়ে নিতে এই সাংবাদিকেরা এখন আরও প্রস্তুত।
প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান ও কৌশল নিয়ে সাংবাদিকেরা ফিরে গেছেন নিজ নিজ কর্মস্থলে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া বক্তব্যই এখন আর তাঁদের প্রতিবেদনের শেষ কথা নয়। কোন সিদ্ধান্ত কীভাবে এবং কেন নেওয়া হলো, সেই প্রশ্ন তুলে সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত এগোনোর প্রস্তুতি এখন তাঁদের রয়েছে। তথ্য-প্রমাণে গাঁথা প্রতিবেদন যেমন সহজে অস্বীকার করা যায় না, তেমনি তা ধামাচাপা দেওয়াও কঠিন। যে মানুষদের নিয়ে তাঁরা লেখেন, তাঁদের মধ্যেই যাঁদের বসবাস, সেই স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য প্রমাণনির্ভর এই সাংবাদিকতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।