প্রকাশকাল: ০৬ অক্টোবর ২০২৬
রাজধানী ঢাকায় তরুণদের অংশগ্রহণে দুই দিনের প্রশিক্ষণের শেষ দিন আজ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বৈচিত্র্যময় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী একদল তরুণ-তরুণী বসে আছেন একই কক্ষে। কারও পরনে ঐতিহ্যবাহী পোশাক। পুরো কক্ষজুড়ে হাসি, কথোপকথন আর দুই দিনের শেখার শেষে অর্জনের এক তৃপ্তির আবহ।
এরপর অংশগ্রহণকারীদের করা হলো প্রশ্ন - “প্রশিক্ষণ কেমন হলো?”
কিছুক্ষণের জন্য সবাই একে অন্যের দিকে তাকালেন। কে প্রথম কথা বলবেন, যেন কেউ বুঝে উঠতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত একজন হাত তুললেন। তিনি উত্তরবঙ্গের ওরাঁও জনগোষ্ঠীর তরুণী বিথি আক্কা। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, একেবারে অকপটে তিনি বললেন—
“তথ্য অধিকার ও ভূমি অধিকার নিয়ে দুই দিনের প্রশিক্ষণটি অসাধারণ ছিল। সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য এ ধরনের আরও প্রশিক্ষণের আয়োজন করার অনুরোধ জানাই। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই সমতলের আদিবাসীরা উপেক্ষিত থাকে।”
বিথির কথায় যেন প্রশিক্ষণের মূল বার্তাটিই উঠে এলো - অধিকার সম্পর্কে জানা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানো যায়।
দুই দিনের এই প্রশিক্ষণে অংশ নেন ১০টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ২৫ জন তরুণ-তরুণী। তাঁরা খাসি, গারো, ওরাঁও, চাকমা, ম্রো, ত্রিপুরা, খিয়াং, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও খুমি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন। আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ও কাপেং ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করে।
প্রশিক্ষণের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট - তরুণদের তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞান এবং ভূমি অধিকার বিষয়ে মৌলিক ধারণা দেওয়া। যাতে তাঁরা সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য চাইতে পারেন, নিজেদের অধিকার সম্পকে© জানতে পারেন এবং অনিয়ম, অসঙ্গতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কার্যকরভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।
তথ্য জানার অধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী’ শব্দটি স্বীকৃতি না দিলেও দেশে ৫০টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এসব জনগোষ্ঠী দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তাদের অনেকের জন্যই ভূমি অধিকার এখনো বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। যথাযথ দলিলপত্রের অভাব এবং ভূমি অধিকার সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের ঘাটতির কারণে অনেকেই বংশপরম্পরায় ভোগদখলে থাকা জমি হারিয়েছেন। তথ্যের সীমিত প্রাপ্তি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তথ্য জানার অধিকার। প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষে নিজেদের অধিকার রক্ষা করা কিংবা সরকারি সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। টিআইবির ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্তি: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’- শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনেক সময় তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
তাই এই প্রশিক্ষণকে কেবল সচেতনতামূলক আয়োজন হিসেবে দেখেনি টিআইবি। এর লক্ষ্য ছিল এমন কিছু ব্যবহারিক জ্ঞান তরুণদের হাতে তুলে দেওয়া, যা তাঁরা নিজেদের জীবনে এবং নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারবেন।
ভূমি অধিকার ও তথ্য অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন সেশনের মাধ্যমে সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী তরুণদের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তথ্য চাওয়া এবং সুশাসন ও জবাবদিহির ঘাটতি থেকে সৃষ্ট অন্যায়ের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় হওয়ার সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। দুই দিনের এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল - তাঁদের এমন সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যারা নিজেদের অধিকার রক্ষা করবেন এবং আরও বেশি জবাবদিহি দাবি করবেন।
দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ: ভূমি ও তথ্য অধিকার
দুই দিনের প্রতিটি সেশনেই গুরুত্ব পেয়েছে অংশগ্রহণ ও পারস্পরিক মতবিনিময়।
প্রথম দিনটি ছিল ভূমি অধিকার নিয়ে। অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার সঙ্গে ভূমির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম ভূমি অধিকারের মৌলিক ধারণা, সংশ্লিষ্ট আইন, প্রথাগত ভূমি ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিকভাবে আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি নিয়ে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের ভূমি অধিকার পরিস্থিতি, আদিবাসীদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবিলার সম্ভাব্য পথ নিয়েও আলোচনা হয়।
শুধু বক্তৃতা বা উপস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না প্রশিক্ষণ। অংশগ্রহণকারীদের ছয়টি দলে ভাগ করে দেওয়া হয়। প্রতিটি দলকে একটি নির্দিষ্ট কাজ দেওয়া হয়। পরে দলগুলো তাদের কাজের ফলাফল প্রশিক্ষকের সামনে উপস্থাপন করে।
প্রথম দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে অনলাইনে যুক্ত হন কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক এবং বর্তমানে এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপলস প্যাক্টের (AIPP) মহাসচিব পল্লব চাকমা। তরুণ অংশগ্রহণকারীদের সক্রিয়ভাবে শেখার পাশাপাশি নিজেদের জনগোষ্ঠী ও পরিচয় নিয়ে গর্বিত হওয়ার এবং অর্জিত জ্ঞান নিজ নিজ সম্প্রদায়ের কল্যাণে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
২০২২ সাল থেকে কাপেং ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যৌথভাবে টিআইবির এ ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজনের উদ্যোগের জন্য তিনি টিআইবিকে ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি আদিবাসী তরুণদের জন্য ধারাবাহিকভাবে শেখার সুযোগ তৈরি করার গুরুত্বও তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় দিন ছিল তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নিয়ে। টিআইবির সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ফারহানা ফেরদৌস অংশগ্রহণকারীদের দেখান, কীভাবে আইনের আওতায় তথ্য চাওয়া যায় এবং কীভাবে তথ্য চেয়ে আবেদন করতে হয়। দলীয় আলোচনা ও বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে কারিগরি এই বিষয়টিকেও অংশগ্রহণকারীদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও নিজ নিজ সম্প্রদায়ের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
অনেকের জন্যই বিষয়গুলো ছিল একেবারে নতুন। মধুপুর, টাঙ্গাইলের গারো জনগোষ্ঠীর বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ জাজং রিচিল বলেন,
“ভূমি অধিকার ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে এত কিছু আগে জানতাম না। তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কেও আগে কিছুই জানা ছিল না। কীভাবে তথ্য চাইতে হয়, সেটাও জানতাম না। এখন জানি।”
অন্য অংশগ্রহণকারীরাও প্রায় একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তাঁদের অনেকেই বলেন, তথ্য ও জ্ঞান কীভাবে নিজেদের অধিকার রক্ষা ও দাবি আদায়ে কাজে লাগানো যায়, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সে বিষয়ে তাঁদের ধারণা আরও পরিষ্কার হয়েছে।
তরুণদের প্রত্যাশা
অংশগ্রহণকারীরা শুধু নতুন জ্ঞান নিয়েই ফিরে যাননি; ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণগুলোকে আরও কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য তাঁরা নিজেদের মতামত ও সুপারিশও তুলে ধরেছেন।
জটিল বিষয়, বিশেষ করে ভূমি অধিকার নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ দিতে তিন দিনের প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন তাঁরা। পাশাপাশি আরও বেশি ব্যবহারিক অনুশীলন ও মাঠভিত্তিক শেখার সুযোগের দাবি জানান। জেলা পর্যায়ে এ ধরনের আরও আয়োজন এবং ভবিষ্যৎ প্রশিক্ষণে সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী তরুণদের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সুপারিশও করেন তাঁরা।
সমাপনী অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। টিআইবির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণকক্ষের বাইরেও অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে তথ্য অধিকার ব্যবহারের পাশাপাশি কীভাবে তথ্য চেয়ে আবেদন করতে হয়, সে বিষয়ে টিআইবি প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানও তরুণদের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন। অংশগ্রহণকারীদের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের কর্মসূচিতে সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকারসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোর প্রতিও আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রয়োজনে টিআইবির পক্ষ থেকে কারিগরি ও আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি। পাশাপাশি শেরপুর, শ্রীমঙ্গল ও মধুপুরের মতো এলাকায় কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে আদিবাসী তরুণদের সঙ্গে টিআইবির সম্পৃক্ততা আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান।
তিনি বলেন, দুই দিনের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়েই টিআইবির সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের সম্পৃক্ততা শেষ হচ্ছে না। তাঁরা এখন থেকে প্রশিক্ষণের অ্যালামনাই হিসেবে পরস্পরের সঙ্গে এবং টিআইবির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
অংশগ্রহণকারী থেকে পরিবর্তনের কারিগর
দুই দিনের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণে উঠে আসা প্রশ্নগুলো ইঙ্গিত দেয় আরও দীর্ঘ এক পথের দিকে। আদিবাসী তরুণদের জন্য তথ্য জানার অধিকার কেবল একটি আইনি ধারণা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে একটি সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ, নিজের সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করা কোনো সিদ্ধান্ত বোঝার সক্ষমতা, কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার শক্তি কিংবা ভূমি ও অন্যান্য অধিকার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ।
তাই এই প্রশিক্ষণের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের অর্জিত জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগান, তার ওপর। প্রশিক্ষণকক্ষে ফিরে তাকালে বিথি আক্কার আরও প্রশিক্ষণের আহ্বানটিই হয়তো সেই প্রয়োজনটিকে সবচেয়ে স্পষ্ট করে তুলে ধরে - বিশেষ করে সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য।
প্রশিক্ষণ তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও তথ্য। এখন সেই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যেতে হবে তরুণদের।