প্রকাশকাল: ১৭ অক্টোবর ২০২৬
আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন, ব্যাগে থাকা ল্যাপটপ কিংবা ঘরভর্তি নানা রকম গ্যাজেট ছাড়া আমাদের দিন চলে না। সকালে ঘুম ভাঙার অ্যালার্ম থেকে শুরু করে রাতের শেষ মেসেজটি পর্যন্ত, ছোট একটি স্ক্রিনেই আবর্তিত হচ্ছে আমাদের পুরো পৃথিবী। কিন্তু প্রযুক্তির এই স্বাচ্ছন্দ্যের পেছনে আমরা প্রতিদিন নিঃশব্দে যে মূল্যটি দিয়ে যাচ্ছি, তা কি কখনো ভেবে দেখেছি?
শখ করে কেনা প্রিয় গ্যাজেটটি পুরোনো হয়ে গেলে আমরা অবহেলায় তা ছুড়ে ফেলি ঘরের কোণের কোনো ড্রয়ারে। দেখতে সাধারণ জঞ্জাল মনে হলেও, এই যন্ত্রগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকে সিসা, পারদ আর ক্যাডমিয়ামের মতো ভয়ংকর বিষাক্ত উপাদান। ড্রয়ার থেকে কাবার্ড, আর কাবার্ড থেকে কোনো খোলা ডাস্টবিন হয়ে এসব বর্জ্য মিশে যায় আমাদের মাটি, পানি আর বাতাসে। এভাবে আমাদের অজান্তেই তা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক বিশাল বিপর্যয় হয়ে ধেয়ে আসছে।
আমাদের ঘরের কোণে জমানো এই ই-বর্জ্য কীভাবে গোটা দেশের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর এই বিপদ সামলানোর পথ কী—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবসে, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে একত্র হন নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স ও আইটি খাতের উৎপাদক, রিসাইক্লিং শিল্পের প্রতিনিধি, গবেষক, গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের বিশিষ্টজনেরা। দিবসটি উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং উই সোসাইটি বাংলাদেশ যৌথভাবে এই “বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা” শীর্ষক অধিপরামর্শমূলক সেমিনারটির আয়োজন করে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আবদুল্লাহ্ জাহীদ ওসমানী। তাঁর উপস্থাপনায় উঠে আসে, দেশে ই-বর্জ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় তথ্যভাণ্ডার নেই। সঠিক তদারকির অভাবে ৯৭ শতাংশ ই-বর্জ্য চলে যাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে, যেখানে সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই বিষাক্ত বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করায় শ্রমিকরা ক্যানসারের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ থাকলেও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
সক্ষমতা আর বাস্তবতার এই ফারাক আরও স্পষ্ট হয় বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস ডিভিশনের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাফিউল আজম পারভেজের উপস্থাপনায়। তিনি জানান, দেশে ১৫টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিদিন ১৮১ টন ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা থাকলেও সংগ্রহ ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতায় এসব প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাচ্ছে মাত্র ১২ টন। ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য, লিথিয়াম ব্যাটারি ও ডেটা নিরাপত্তার সংকট কাটাতে বিটিআরসির গাইডলাইন যুগোপযোগী করা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধ ও উপস্থাপনাগুলো অংশগ্রহণকারীদের সামনে ই-বর্জ্যের বাস্তব চিত্র ও সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে তোলে। এরপর খাতভিত্তিক প্যানেল আলোচনায় অভিজ্ঞ বক্তারা চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ নিয়ে কথা বলেন। টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিভাগের কো-অর্ডিনেটর ড. নাবিল হকের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে, বিবিএস, বুয়েট ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে অমিল থাকায় অবিলম্বে একটি জাতীয় বেসলাইন সার্ভে প্রয়োজন। এ জন্য এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর)—অর্থাৎ পণ্যের ব্যবহার শেষ হলে তার বর্জ্য সংগ্রহ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির দায়ও উৎপাদকের—এই নীতি বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
টেলিকম ও ইন্টারনেট খাতের প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে, নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের গতির তুলনায় ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং অপ্রতুল। এ ছাড়া ডিভাইস পুনঃব্যবহারে সুনির্দিষ্ট নীতির অভাবের কথা তুলে ধরে বক্তারা বায়োমেট্রিক ও এনআইডির মতো সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ‘ডিগাউসিং’ ও ডিকম্পোজিশন বাধ্যতামূলক করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাজারে থাকা পণ্যের আয়ুকাল তদারকিতে একটি জাতীয় ‘ই-রেজিস্ট্রি’ গড়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প খাতের ই-বর্জ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে, শিপ ব্রেকিংয়ের নামে আসা অকেজো ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের হেভি মেটাল মাটি ও পানি দূষিত করে উপকূলীয় পরিবেশ ও শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় শিপ ব্রেকিং আইনের নতুন সংশোধনীতে ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি (টিএসডিএফ), অর্থাৎ বিপজ্জনক বর্জ্য শোধন, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, যুক্ত করে এ ধরনের বর্জ্যকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রচেষ্টা চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে সমস্যার মূলে আলো ফেলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সুশাসনের ঘাটতি আর নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ না থাকার কারণেই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি আজ অনিয়ন্ত্রিত খাতের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই সুশাসন কাঠামোর আওতায় আনাই মূল লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিটি অংশীজনের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা এবং অবৈধ লেনদেন রোধ করা জরুরি।
সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. মোঃ সাইমুম পারভেজ। তিনি বলেন, সরকার সুশাসন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ‘থ্রি-আর’ (রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল) নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং হাব ও ম্যাটেরিয়াল রিকভারি সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করবে।
সেমিনার থেকে সংকট উত্তরণে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উঠে আসে: একটি জাতীয় ই-বর্জ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি, উৎপাদকদের জন্য ইপিআর নীতি নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিটিআরসির সমন্বয় জোরদার এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ। নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উৎপাদক ও রিসাইক্লিং শিল্পের প্রতিনিধিদের এক মঞ্চে এনে সেমিনারটি এসব সুপারিশ সরাসরি সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়, আর সরকারের পক্ষ থেকেও আসে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে রিসাইক্লিং হাব স্থাপনের পরিকল্পনার কথা।
ঘরের কোণের ড্রয়ারে পড়ে থাকা পুরোনো ফোনটি তাই কেবল জঞ্জাল নয়। এই বিষাক্ত ই-বর্জ্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে ঠিকই, কিন্তু সঠিক সুশাসন, সরকারি নজরদারি ও নাগরিক সচেতনতা থাকলে এই বর্জ্যই হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক সম্পদ।