প্রকাশকাল: ০৭ অক্টোবর ২০২৬
“কেউ যখন ক্রিপ্টো-ওয়ালেট ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অবৈধ সম্পদ সরিয়ে ফেলে, তখন কাগজপত্র বা ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়ে সেই অর্থের আর কোনো হদিস পাওয়া যায় না।” কথাগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক তদন্ত কর্মকর্তার। এই হতাশা শুধু তাঁর একার নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করা দুদকের অনেক তদন্ত কর্মকর্তারই। দুর্নীতিবাজরা এখন অবৈধ বা আয়বহির্ভূত সম্পদ আড়াল করছে ডিজিটাল মুদ্রায়, দেশের বাইরে পাচার করছে, লুকিয়ে রাখছে নানা কোম্পানির জটিল মালিকানা-কাঠামোর আড়ালে। নথিনির্ভর প্রচলিত তদন্ত-পদ্ধতিতে তাদের ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে। দুদক কর্মকর্তার মতে, এমন অপরাধীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে অফিসে বসে নথি ঘাঁটার পাশাপাশি তদন্তকারীদের ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেন অনুসরণে দক্ষ হতে হবে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে কাঠামোগত দুর্নীতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, যা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে টিআইবি। বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে আড়াল করা অপ্রদর্শিত বা পাচার হওয়া অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেতে দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে দুদকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় এবার পঞ্চমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো ‘ডিজিটাল ফরেনসিক, ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি’ শীর্ষক তিন দিনের এক ট্রেনিং। গত ৩ থেকে ৫ অক্টোবর, ২০২৬ টিআইবির ‘মেঘমালা কনফারেন্স রুমে’ দুদকের মোট ৩০ জন তদন্ত কর্মকর্তা (ঢাকার প্রধান কার্যালয়ের মোট ১৮ জন কর্মকর্তা এবং ১২ জন বিভিন্ন জেলা কার্যালয় থেকে) অংশগ্রহণ করেছেন।
ট্রেনিং’র প্রথম অধিবেশনের বিষয়বস্তু ছিল আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন ও অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন ব্যালান্স শিট, আয় বিবরণী ও নগদ প্রবাহ বিবরণী ধরে ব্যাখ্যা করেন, সাধারণ নিরীক্ষার সঙ্গে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিংয়ের পার্থক্য কোথায় এবং বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পতনের বাস্তব উদাহরণ বিশ্লেষণ এবং বেনফোর্ডস ল-এর মতো ডেটা বিশ্লেষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করে কর্মকর্তারা কীভাবে অনুশীলন করেন, নিয়মিত নিরীক্ষায় সচরাচর যেসব অসংগতি চোখ এড়িয়ে যায়, সেগুলো কীভাবে শনাক্ত করা যায় সেসব বিষয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেন। শেয়ারবাজারে ইনসাইডার ট্রেডিং, স্পুফিং, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প ও আর্নিংস ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কীভাবে কারসাজি হয়, সেটিও আলোচনায় আসে। পাশাপাশি কোসো (COSO) কাঠামো অনুযায়ী কোনো প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে কীভাবে আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের খোঁজ পাওয়া যায়, সে বিষয়েও ধারণা পান অংশগ্রহণকারীরা।
দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে আলোচনা হয় ডিজিটাল লেনদেন ও ভার্চুয়াল সম্পদ নিয়ে। মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালায়ার আইন অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এরশাদুল করিম ইন্টারনেট ইকোসিস্টেম, ই-মানি এবং কেন্দ্রীভূত ও বিকেন্দ্রীকৃত ভার্চুয়াল মুদ্রার পার্থক্য তুলে ধরেন। ব্লকচেইন ও ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার কীভাবে কাজ করে, বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির পেছনে কোন ধরনের ক্রিপ্টোগ্রাফি থাকে, সেগুলোও সহজ করে ব্যাখ্যা করেন তিনি। আলোচনায় উঠে আসে এ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কাঠামো এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা। এরপরের সেশনে কর্মকর্তারা ফরেনসিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণের কৌশল, বিকেন্দ্রীকৃত নেটওয়ার্কে অবৈধ লেনদেন কীভাবে অনুসরণ করতে হয়, পারস্পরিক আইনি সহায়তা কীভাবে কাজে লাগানো যায় এবং ভার্চুয়াল সম্পদের খোঁজ করতে গিয়ে কি ধরনের আইনি ও করসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয় এসমস্ত বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারেন। ট্রেনিং এর শুরুতে দুদকের যে তদন্ত কর্মকর্তা ক্রিপ্টো-ওয়ালেটে সরানো অর্থের হদিস না পাওয়ার কথা বলেছিলেন, সেই সমস্যার সমাধানের পথ বের করাই ছিলো এই অধিবেশনের মূল বিষয়।
দুদিনের তাত্ত্বিক আলোচনার পর শেষ দিনে ছিলো ব্যবহারিক অনুশীলনের অধিবেশন। টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক, মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের কাজটি যেনো শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না হয়ে বরং প্রত্যেক তদন্ত কর্মকর্তার নিয়মিত কাজের অংশ হয়ে ওঠে সেটাই অংশগ্রহণকারীদের হাতে-কলমে দেখান। ওপেন সোর্স ডেটা ও বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করে কিভাবে কোনো সম্পদের প্রকৃত মালিককে সহজেই সনাক্ত করা যায়, আয়বহির্ভূত বা অপ্রদর্শিত সম্পদের সন্ধান এবং পাচার হওয়া সম্পদের খোঁজ কিভাবে ডিজিটাল তদন্তের মাধ্যমে বের করা যায় সেটি তিনি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন।
তিন দিন ব্যাপি এই ট্রেনিং-এর অন্যতম বড় প্রাপ্তি টিআইবি সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের ধারনা পরিবর্তন! অনেকেই জানান, এত দিন তাঁরা টিআইবিকে মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা করা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করা একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে জানতেন। কিন্তু এবার তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে, টিআইবির কাছে এমন ডেটাবেজ ও টুল রয়েছে, যা অপ্রদর্শিত বা পাচার হওয়া সম্পদের খোঁজ ও ডিজিটাল তদন্তে সহায়ক হতে পারে; অর্থাৎ তদন্তকাজেও টিআইবি দুদকের একটি কার্যকর সহযোগী সংস্থা হয়ে একযোগে কাজ করতেও সক্ষম!
ট্রেনিং-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দুদকের কমিশনার (তদন্ত) ড. জাহাংগীর আলম খান। অপরাধের ধরন যে বদলে যাচ্ছে, সে কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তঃসীমান্ত দুর্নীতি, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও অবৈধ বা অপ্রদর্শিত সম্পদের তদন্তে শুধু অফিসকেন্দ্রিক অনুসন্ধান যথেষ্ট নয়; এর জন্য আরও বিস্তৃত ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত-পদ্ধতিরও প্রয়োজন আছে।
সবশেষে, সফলভাবে ট্রেনিং সুসম্পন্ন করার জন্য অংশগ্রহণকারী দুদক কর্মকর্তাদের মাঝে সার্টিফিকেট বিতরণ করা হয়। সেসময়, টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা, অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের বলেন, “নিয়মিত চর্চার মধ্য দিয়েই আমরা সবাই দক্ষতা অর্জন করি। তিনি কর্মকর্তাদের অর্জিত জ্ঞান প্রতিদিনের তদন্তকাজে প্রয়োগের আহ্বান জানান”। এছাড়াও সমাপনী অধিবেশনে আরো উপস্থিত ছিলেন, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি দুই প্রতিষ্ঠানের অভিন্ন লক্ষ্যের কথা তুলে ধরে বলেন, “দুদক সফল হলেই টিআইবি সফল হবে, কারণ টিআইবির সাফল্য মৌলিকভাবে দুদকের কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত।” জটিল তদন্ত ও ওপেন সোর্স ডেটা ব্যবহারে দুদকের প্রতি টিআইবির সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
ট্রেনিং শেষে দুদকের ত্রিশজন তদন্ত কর্মকর্তা এখন ঢাকা ও নিজ নিজ জেলা কার্যালয়ে ফিরে গেছেন। আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ, ক্রিপ্টো লেনদেন অনুসরণ এবং ওপেন সোর্স ডেটা ব্যবহার করে অপ্রদর্শিত বা আয়বহির্ভূত সম্পদ সনাক্তের নতুন কৌশল এখন আর তাঁদের কাছে অজানা কোন বিষয় নয়। অনানুষ্ঠানিক বিভিন্ন তথ্যসূত্রকে সমন্বয় করে এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে জটিল আর্থিক অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনে তাঁরা সকলেই আগের চেয়ে বেশি দক্ষ হয়ে ফিরেছেন। যেসমস্ত অবৈধ সম্পদের সন্ধান পাওয়া একসময় প্রায় অসম্ভব মনে হতো, এখন তা সূত্র ধরে এগোনোর জন্য তাঁরা সকলেই আগের চেয়ে আরো ভালোভাবে প্রস্তুত! আমরা আশা করতে পারি যে, দুদক ও টিআইবির এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।