তথ্য অধিকার সম্মেলন ২০২৬

কাগজে-কলমে অধিকার ও বাস্তবতা: তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে এখনো চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

প্রকাশকাল: ০৫ অক্টোবর ২০২৬

কাগজে-কলমে তথ্য জানার অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো বেশ শক্তিশালী। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিকদের সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য চাওয়ার অধিকার দিয়েছে। তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দেশগুলোর আইনি কাঠামো কতটা শক্তিশালী, সেই মূল্যায়নে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২৭তম। তবে আইনে অধিকার নিশ্চিত থাকলেই বাস্তবে মানুষ সেই অধিকার সহজে ও নির্ভয়ে প্রয়োগ করতে পারে এমনটি বলা যায়না ।

তাই, তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের ১৭ বছর পরও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে: বাস্তবে তথ্য কতটা সহজলভ্য? আর তথ্য চাইতে গিয়ে নাগরিকরা কতটা আত্মবিশ্বাসী?

২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত তথ্য অধিকার সম্মেলনে এ সকল প্রশ্নই বিশেষভাবে সামনে আসে। আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস উপলক্ষে আরটিআই ফোরাম আয়োজিত এ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে যুক্ত ছিল। সম্মেলনে ২০০-এর বেশি এনজিওকর্মী, নীতিবিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষক অংশ নেন।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘বাংলাদেশ তথ্য অধিকার জরিপ ২০২৬: ফলাফল ও করণীয়’ শীর্ষক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যা বাস্তব পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে। জরিপের প্রধান গবেষক ড. অনন্য রায়হান জানান, ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের তথ্যের চাহিদা রয়েছে, অথচ মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সক্রিয়ভাবে তথ্যের জন্য আবেদন করেন। তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে উত্তরদাতারা সচেতনতার অভাব ও জটিল প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে সাধারণ সচেতনতার হার মাত্র ১০ দশমিক ৫ শতাংশ, আর সঠিকভাবে কীভাবে আবেদন করতে হয় তা জানেন মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ।

সমস্যাটি তাই শুধু বাংলাদেশে একটি তথ্য অধিকার আইন আছে কি না-তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, নাগরিকরা এই অধিকার ব্যবহার করতে কতটা সক্ষম এবং কতটা আগ্রহী।

কেন এখনও আইনটি ব্যবহারে অনাগ্রহী নাগরিকরা

আরটিআই ফোরামের আহ্বায়ক ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম জরিপের ফলাফলকে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১৯ সালে যেখানে তথ্য অধিকার বিষয়ে সচেতনতার হার ছিল প্রায় ৬ শতাংশ, তা বেড়ে এখন প্রায় ১০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের ১৭ বছর পর এই অগ্রগতি যথেষ্ট নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ৬৪ শতাংশ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডেজিগনেটেড অফিসার) কখনো তথ্যের জন্য কোনো আবেদন পাননি।

এটি তথ্য চাওয়ার দিকের একটি মৌলিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। যেসব এলাকায় এনজিওগুলো সক্রিয়ভাবে মানুষকে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহারে উৎসাহিত করেছে, সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তথ্য চাওয়ার আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের আওতায় না থেকে নিয়মিত উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে তথ্য অধিকারকে মূলধারায় যুক্ত করার উদ্যোগ তুলনামূলকভাবে কম সফল হয়েছে।

তথ্য চাওয়ার এই সীমিত প্রবণতার পেছনে রয়েছে আরও গভীর একটি সমস্যা- গোপনীয়তা ও ভয়ের সংস্কৃতি। নাগরিকরা প্রায়ই অনিয়ম প্রত্যক্ষ করলেও কীভাবে বা কেন তা ঘটেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করেন না। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের জন্য সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ভয় পেতে পারেন, এনজিওগুলো প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কা করতে পারে, এমনকি কোনো কর্মকর্তা মৌখিকভাবে তথ্য দিতে সম্মত হলেও লিখিতভাবে তা দিতে দ্বিধা করতে পারেন।

তবে শাহীন আনাম জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে তথ্য চাওয়া কোনো বেআইনি কাজ নয়। তাঁর মতে, বিপুলসংখ্যক নাগরিক তথ্যের জন্য আবেদন করলে ধীরে ধীরে গোপনীয়তার এই সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, যেসব জনগোষ্ঠী তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি বাধার মুখোমুখি হয়, তাদের কাছেও তথ্যের সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। তাঁর মতে, জরিপের ফলাফল শুধু আলোচনার বিষয় হয়ে থাকলে চলবে না; তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণেও এসব ফলাফল কাজে লাগাতে হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক বাধা

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ব্যক্তিগত অনাগ্রহের পরিবর্তে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে। তাঁর মতে, ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ শুধু আইন বা নাগরিকের সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত বৃহত্তর আমলাতান্ত্রিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ।

তাঁর মতে, এখন শুধু সচেতনতার মাত্রা পরিমাপ করাই যথেষ্ট নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো দূর করার কৌশল তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক ও আচরণগত পরিবর্তন। রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনার জন্য আইনি সংস্কারেরও আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে এনজিও ও গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথাও তিনি তুলে ধরেন।

প্রাতিষ্ঠানিক এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে তথ্য কমিশন। যে প্রতিষ্ঠান তথ্য জানার অধিকার বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে, সেটি যদি স্বাধীনতা, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের দিক থেকে দুর্বল হয়, তাহলে শুধু আইন থাকলেই অর্থবহ তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তথ্যপ্রাপ্তি থেকে নিরাপত্তা

ব্যারিস্টার সারা হোসেন আলোচনায় সমস্যাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। মানুষ হয়তো জানে যে প্রশ্ন করার অধিকার তার রয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন করার পর কী ঘটতে পারে- সেই ভয় তাকে পিছিয়ে দিতে পারে।

জরিপের ফলাফল বলছে, প্রান্তিক, দরিদ্র ও কম ক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর তথ্য অধিকার ব্যবহারের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। কোনো এনজিও কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তুললে প্রশাসনিক হয়রানি কিংবা তার কর্মী ও সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের আশঙ্কা থাকতে পারে। ফলে আইনে অধিকার থাকা এবং নিরাপদে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়।

সারা হোসেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সীমিত সক্ষমতার বিষয়টিও তুলে ধরেন। ৬৪ শতাংশ কর্মকর্তা যেখানে কখনো কোনো তথ্যের আবেদন পাননি, সেখানে জরিপ অনুযায়ী মাত্র ৪৯ শতাংশ কর্মকর্তা তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য দুই পক্ষেরই সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। নাগরিকদের জানতে হবে কীভাবে তথ্য চাইতে হয়, আর কর্মকর্তাদের জানতে হবে কীভাবে সেই তথ্যের আবেদনে সাড়া দিতে হয়।

প্রয়োগ ও প্রতিকারের ঘাটতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সারা হোসেন উল্লেখ করেন, তথ্য কমিশনের ৩৮ শতাংশ সিদ্ধান্ত সরকারি কর্তৃপক্ষ বাস্তবায়ন করেনি। এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- তথ্য কমিশনের অনুকূল সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরও যদি তথ্য না মেলে, তাহলে কী হবে?

তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে নাগরিক ও সংগঠনগুলো যাতে কার্যকরভাবে প্রতিকার চাইতে পারে, সে জন্য আরও শক্তিশালী আইনি ও প্যারালিগ্যাল সহায়তা প্রয়োজন।

অধিকারকে বাস্তবে রূপ দেওয়া

সম্মেলনের আলোচনায় তাই স্পষ্ট হয়েছে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়েছেন এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও রয়েছে। কিন্তু সচেতনতা, তথ্য চাওয়ার প্রবণতা, কর্মকর্তাদের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং তথ্য-অনুসন্ধানকারীদের নিরাপত্তা - সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

এখানেই তথ্য অধিকার নিয়ে টিআইবির দীর্ঘদিনের অধিপরামর্শ ও কার্যক্রমের প্রাসঙ্গিকতা সামনে আসে। টিআইবি ২০০৬ সাল থেকে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস পালন করে আসছে এবং কার্যকর তথ্যপ্রাপ্তি, স্বাধীন তথ্য কমিশন ও তথ্য অধিকার আইন সংস্কারের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে অধিপরামশ© পরিচালনা করে আসছে। তথ্য অধিকার মেলা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং জাতীয় ও মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন প্রচারাভিযানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আইনে স্বীকৃত এই অধিকারকে কেবল আইনগ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর করার চেষ্টা করে আসছে।

সম্মেলনের আলোচনায় শেষ পর্যন্ত একটি সহজ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: তথ্য জানার অধিকারের প্রকৃত পরীক্ষা শুধু আইনের শক্তিতে নয়; বরং সাধারণ নাগরিক কতটা নিরাপদে প্রশ্ন করতে পারেন এবং সেই প্রশ্নের অর্থবহ উত্তর পান কি না - তার ওপরই নির্ভর করে।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি