নীতিগত দুর্বলতা ও প্রায়োগিক অরাজকতার শিকার বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনিয়ম প্রতিরোধ ও সুশাসনের লক্ষ্যে ১২ দফা সুপারিশ টিআইবির

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিগত দুর্বলতা ও প্রায়োগিক অরাজকতার শিকার বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ টিআইবির ধানমণ্ডি কার্যালয়ে “বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়” শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করা হয়। এ সময় জানানো হয়, বাংলাদেশে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত ই-বর্জ্যের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও এর সঠিক ব্যবস্থাপনায় নীতিনির্ধারণী স্থবিরতা ও সুশাসনের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। দেশে উৎপাদিত প্রায় ই-বর্জ্যরে ৯৭ শতাংশ কোনো ধরনের প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই- পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন উপায়ে- অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে; আর প্রাতিষ্ঠানিক পুনঃপ্রক্রিয়ার আওতায় আসছে মাত্র ৩ শতাংশ।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান। আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের পরিচালনায় সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিভাগের কোঅর্ডিনেটর ড. নাবিল হক এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আবদুল্লাহ্ জাহীদ ওসমানী।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে আইনি ও নীতিগত ঘাটতি এবং প্রায়োগিক অরাজকতার শিকার। আমদানি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও জবাবদিহিহীন অনিয়মের মাধ্যমে হাজার হাজার টন বিষাক্ত ই-বর্জ্য দেশে ঢুকছে, অন্যদিকে বাসেল কনভেনশনের তোয়াক্কা না করেই ই-বর্জ্য উপাদান বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে; যা পরিবেশ অধিদপ্তরসহ তদারকি সংস্থাগুলোর পেশাগত ব্যর্থতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচায়ক। ভাঙ্গারিওয়ালা ও ই-বর্জ্য পুনঃব্যবহারযোগ্যকারীদের পরিবেশগত ছাড়পত্র ও নিবন্ধন প্রাপ্তিতে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন; অবৈধভাবে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানকর্তৃক ই-বর্জ্য রপ্তানি এবং নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ই-বর্জ্য আমদানি- ইত্যাদি অনিয়মের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনকর্তৃক ক্রয়কৃত ইভিএম মেশিনগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিরূপন না করা এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতা বড় ধরনের ই-বর্জ্য ঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। একইভাবে জাহাজভাঙা শিল্প, গাড়ি, বিদ্যুতচালিত গাড়ি, সোলার প্যানেল, ব্যাটারিচালিত খেলনা, ড্রোন ইত্যাদি দ্রব্যের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট বিধিমালা না থাকা, ব্যবহারকারীদের অসচেতনতা ও নজরদারি সংস্থার ব্যর্থতা একদিকে বিশাল স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে বর্জ্যকে সম্ভাব্য সম্পদে রূপান্তরের সম্ভাবনা পদদলিত করছে।’

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকার বিদ্যমান অরাজকতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অবসান ঘটিয়ে জাতীয় স্বার্থে টিআইবির গবেষণালব্ধ সুপারিশসমূহ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে। যথাযথ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষসহ প্রণোদনার মাধ্যমে মূল্যবান ধাতু আহরণের সুযোগ সৃষ্টি করে, এই খাতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় করে তুলতে যথাযথ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এই লক্ষ্যে পূর্বশর্ত হিসেবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান আইন, বিধি ও নীতিমালায় চিহ্নিত দুর্বলতা দূর করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রায়োগিক সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই বিষাক্ত বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক অপ্রতিরোধ্য বিপর্যয় ডেকে আনবে।’

গবেষণায় দেখা গেছে, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আইনি কাঠামোটি বর্তমানে মূলত কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ই-বর্জ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাসেল কনভেনশনের পিআইসি অনুমোদন ব্যবস্থার চরম লঙ্ঘন করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীরা প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ডসহ (পিসিবি) বিভিন্ন উপাদান বিদেশে রপ্তানি করছে। এমনকি নিবন্ধিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি ই-বর্জ্য রপ্তানি করছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি দুর্বলতার পাশাপাশি সম্ভাব্য দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে প্রতিফলিত করে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝুঁকিপূর্ণ ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ প্রণয়নের চার বছর পেরিয়ে গেলেও এর প্রয়োগে কার্যকর কোনো অগ্রগতি নেই। উল্টো, সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিগত তিন বছরে সাত লাখ ডলার সমমূল্যের প্রায় ১৫ হাজার টন ই-বর্জ্য নিয়মবহির্ভূতভাবে আমদানি করা হয়েছে, যা রপ্তানিকৃত ৪,০৪০ টনের চেয়েও বেশি। দেশের ৮৮ শতাংশ ভোক্তা ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন এবং ৭২ শতাংশই তাদের অচল সরঞ্জামগুলো বাড়িতে অনিরাপদ অবস্থায় ফেলে রাখছেন। এর ফলে নির্গত আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম ও সীসার মতো বিষাক্ত ভারি ধাতু পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, বিশেষ করে ই-বর্জ্য চূর্ণ করণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে সম্পৃক্ত নারীরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন।

গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যবহৃত সোলার প্যানেল ই-বর্জ্যের নতুন উৎস হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে সোলার প্যানেল থেকে প্রায় ৫.৫ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য তৈরি হবে। একইসঙ্গে, গত তিন অর্থবছরে ১৬,৭২৪ টি ইলেকট্রিক যানবাহন আমদানি করা হলেও এগুলোর ব্যাটারি ও বর্জ্য প্রাক্কলনের কোনো ব্যবস্থা নেই; তথ্য ব্যবস্থাপনায়ও চরম সমন্বয়ের অভাব লক্ষ করা গেছে। বিটিআরসিতে ১৪টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত থাকলেও তার অর্ধেকই পরিবেশ অধিদপ্তরের নিবন্ধন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিদ্যমান এই অরাজকতা নিরসনে গবেষণা প্রতিবেদনে ১২ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। সুপারিশমালা অনুযায়ী, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১ এবং বাসেল কনভেনশনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ আমদানি ও রপ্তানি অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে; তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত ছাড়পত্র ও নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন ও দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করতে হবে; পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিটিআরসির মধ্যে সমন্বিত ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবা চালু করে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে; অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ভাঙ্গারিওয়ালাদের আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতাভুক্ত করতে হবে এবং সোলার প্যানেল ও ইলেকট্রিক যানবাহনের বর্জ্য মোকাবিলায় এখনই একটি দীর্ঘমেয়াদী “ই-বর্জ্য রোডম্যাপ” প্রণয়ন করতে হবে।

গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org

প্রতিবেদনসংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্রঃ https://ti-bangladesh.org/articles/research/7424

Read in English

E-waste Management in Bangladesh Victim of Weak Policy and Systemic Disorder TIB Proposes 12-point Recommendation for Good Governance and Preventing Irregularities


Press Release