প্রকাশকাল: ২০ আগস্ট ২০২৬
মধুপুরের বনে বাস করতেন জয়ানগাছা গ্রামের গারো যুবক পিরেন স্নাল। তাঁর পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই বন ও এর ভূমির ওপর নির্ভর করেছে। এই বনের সঙ্গে তাদের গড়ে উঠেছিল এক নিবিড় সখ্য; তাই বন ও ভূমির রক্ষকও ছিল তারাই। পিরেন ছিলেন তাঁর পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তাঁকে নির্ভর করতে হতো এই ভূমির ওপর।
তখন সময়টি ছিল ২০০৪ সালের ৩ জানুয়ারি সকাল। পিরেন জানতে পারেন, বন বিভাগের কর্মকর্তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে পাশের জলাবাদা এলাকায় একটি ‘ইকো-পার্ক’-এর সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করতে এসেছে। প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৩ হাজার একর বনভূমি ঘেরাও করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা গারো ও কোচ পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি, ক্ষেত ও জীবিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। এই উদ্যোগে এই সম্প্রদায়ের জীবিকা ধ্বংসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তাই পিরেন তাঁর সম্প্রদায়ের ভূমি - যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের বসবাস- রক্ষায় প্রকল্পটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শত শত আদিবাসী গ্রামবাসীর সঙ্গে যোগ দেন।
প্রতিবাদের একপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়। পিরেন বুকে গুলিবিদ্ধ হন এবং নারী ও শিশুসহ ২৫ জনের বেশি আদিবাসী প্রতিবাদকারী সেদিন আহত হন। দিন শেষে পিরেন আর তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারেননি।
পরবর্তীতে ইকো-পার্ক প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যে ভূমির জন্য পিরেনের জীবন হারাতে হয়েছিল, সেই সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামনে এখনো একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন -তাদের পূর্বপুরুষের ভূমির ওপর অধিকার কার?
দশকের পর দশক ধরে দেশের সমতল ও পাহাড় - উভয় অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী ভূমি বিরোধ, উচ্ছেদ ও পূর্বপুরুষের ভূমি নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়ে আসছে। লক্ষণীয় যে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রয়েছে প্রথাগত ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা, যা প্রচলিত ভূমি ব্যবস্থার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। তাদের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক দলিলের পাশাপাশি সামাজিক স্বীকৃতি ও মৌখিক ঐতিহ্যেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু এসব প্রথাগত ব্যবস্থার পর্যাপ্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায় ভূমি দখল, বিরোধ এবং আইনি প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সম্প্রদায় নানা বাধার সম্মুখীন হয়।
আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থা ও প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থার মধ্যে এই ব্যবধান কেবল আইনি সমস্যা নয়; এটি একটি সুশাসনের সমস্যাও। তাই প্রথাগত মালিকানার স্বীকৃতি, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ভূমি তাদের জীবনধারণের ভিত্তি হয়ে আছে, তা রক্ষা করা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এই উদ্বেগগুলোকে সামনে রেখে প্রতিবছর আগস্টে আদিবাসী নেতা, আদিবাসী তরুণ, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করেন এবং ভূমি, পরিচয়, সংস্কৃতি ও অধিকার নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ তুলে ধরেন। তাঁদের মূল বার্তা স্পষ্ট - স্বীকৃতির পাশাপাশি ভূমি, পরিচয়, সংস্কৃতি ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এ বছর ৯ আগস্ট, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে ভূমি ন্যায়বিচার, স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির বিষয়গুলোকে জনপরিসরে তুলে ধরতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দেশের বৃহত্তম আদিবাসী অধিকারভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের (বিআইপিএফ) সঙ্গে যুক্ত হয়। এর আগে, গত ৬ আগস্ট, টিআইবি, বিআইপিএফ, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) এবং অন্যান্য নাগরিক সমাজের সংগঠন “Indigenous Peoples: Life, Land Rights, and Respect for Culture” শীর্ষক আলোচনা আয়োজন করে। দুই আয়োজনেই বক্তারা একই উদ্বেগের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে দাবি তোলেন- স্বীকৃতিকে অবশ্যই কার্যকর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষায় রূপ দিতে হবে।
প্রথাগত ভূমি মালিকানা যখন আইনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায় না
বাংলাদেশের প্রচলিত ভূমি খাতেও সুশাসনের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। টিআইবির খানা জরিপ ২০২৫ অনুযায়ী, ভূমিসেবা গ্রহণকারী ৬৬.৩ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে; আর দুর্নীতির শিকার পরিবারগুলোর মধ্যে ঘুষ হিসেবে গড়ে ১১ হাজার ৩১১ টাকা দিতে হয়েছে। অর্থাৎ, এটি স্পষ্ট যে দেশের ভূমি ব্যবস্থা ইতিমধ্যে জটিল এবং এর ওপর প্রচলিত ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা নাগরিকদের জন্য আরও বেশি ঝামেলাপূর্ণ ও হয়রানিমূলক। আর এই প্রচলিত ভূমি প্রশাসন ব্যবস্থায় যখন আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি মালিকানার যথাযথ স্বীকৃতি থাকে না, তখন তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। যা সুশাসনের ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ভূমি তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা। ভূমির অনিশ্চয়তা শুধু একটি পরিবারের জীবিকাকেই হুমকির মুখে ফেলে না; আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে পূর্বপুরুষের ভূমি তাদের সংস্কৃতি, সামাজিক জীবন ও পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। তাই আগস্টের দুই আয়োজনেই (৯ ও ৬ আগস্ট) অন্যতম প্রধান দাবি ছিল আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি মালিকানার আইনি স্বীকৃতি।
৯ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতি জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ভূমি সুরক্ষার আইনি ভিত্তির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি প্রথাগত ভূমি মালিকানার আইনি স্বীকৃতির অভাবকে বিদ্যমান কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এই ঘাটতি যেন আদিবাসীদের ভূমি দখল বা অপব্যবহারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য আইন সংস্কারের আহ্বান জানান।
আইনি স্বীকৃতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষায় আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি দিতে পারে, বিরোধের ক্ষেত্রে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে এবং ভূমির সঙ্গে যুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চা ও জীবনযাত্রা সুরক্ষায় সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু আইনি স্বীকৃতিই যথেষ্ট নয়; স্বীকৃতিকে কার্যকর করার মতো প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামে (সিএইচটি) ড. ইফতেখারুজ্জামান এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান, যাতে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির আওতায় গঠিত ভূমি কমিশন কার্যকর ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি আরও স্পষ্ট। ভূমিসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে তারা দীর্ঘদিন ধরে পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এ ধরনের একটি কমিশন দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, অভিযোগের প্রতিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য একটি নিবেদিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। পূর্বপুরুষের ভূমি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা ভূমির নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অধিকার রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা বাড়াতে পারে।
স্বীকৃতি ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ
ভূমি সুরক্ষার প্রশ্নটি বৃহত্তর স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত। ৬ ও ৯ আগস্টের দুই আয়োজনেই টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আদিবাসীদের পরিচয় ও মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি শুধু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সকল মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্যও জরুরি। তিনি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ স্বীকৃতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। আদিবাসী নেতা, শিক্ষাবিদ, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও সাংবিধানিক স্বীকৃতি, রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী দিবস পালন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন এবং অধিকার ও কল্যাণ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দাবি জানান।
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ ও দেশের অভ্যন্তরীণ স্বীকৃতির ব্যবধান তুলে ধরে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে (UNPFII) অংশ নিলেও আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করে না। তিনি সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের আহ্বান জানান।
সংস্কৃতি ও জীবিকার প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাধবী মারমা আদিবাসীদের জ্ঞান ও প্রথার প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানান। বিশেষ করে জুম চাষের কথা উল্লেখ করে তিনি আদিবাসীদের জীবিকা ও ঐতিহ্য সুরক্ষার পাশাপাশি এর উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
বিআইপিএফ-এর সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং এসব দাবিকে একটি বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত করেন। “রংধনু জাতি”-র ধারণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভেদের কারণ হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা, অংশীদারিত্ব ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, স্বীকৃতি কেবল প্রতীকী বিষয় নয়। আইনি স্বীকৃতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, সংস্কৃতির সুরক্ষা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান – এ সকল পদক্ষেপ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের অধিকার সুরক্ষিত করতে, ন্যায়বিচার চাইতে এবং জনজীবনে সমভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কী পরিবর্তন আসতে পারে?
দাবিগুলোকে কেবলমাত্র নতুন নীতি প্রণয়নের আহ্বান হিসেবে দেখলে হবে না; এগুলো সত্যিকার অর্থেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমানের সরাসরি পরিবর্তনের অন্যতম নিয়ামক। প্রথাগত ভূমি মালিকানার আইনি স্বীকৃতি, কার্যকর ভূমি কমিশন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ পথরেখা ভূমির নিরাপত্তা বাড়াতে, ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ উন্নত করতে, সাংস্কৃতিক পরিচয় সুরক্ষিত করতে এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে। আদিবাসীদের পূর্বপুরুষের ভূমি অনিরাপদ হলে জীবিকা, সংস্কৃতি, সামাজিক জীবন ও পরিচয়- সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে। সেগুলো সুরক্ষায় তাই এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যারা আদিবাসীদের অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে, তাদের অভিযোগের জবাব দেবে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালনে জবাবদিহির মধ্যে থাকবে।
এখানেই সুশাসন অপরিহার্য। আদিবাসী দিবসে টিআইবির সম্পৃক্ততা তাই কেবল প্রতীকী সংহতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আদিবাসীদের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবির পাশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এসব অধিকার নিশ্চিত করা শুধু আদিবাসী ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয় - এটি সুশাসন, জবাবদিহি ও আইনের শাসন সত্যিই সবার জন্য কাজ করছে কি না, তারও একটি পরিমাপক।