যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় শুদ্ধাচার ও জবাবদিহি

শুধু চিকিৎসা নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি: যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় টিআইবির নতুন উদ্যোগ

প্রকাশকাল: ০৬ জুলাই ২০২৬

একজন গর্ভবতী নারী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রে এসেছেন নিয়মিত পরীক্ষা করাতে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর জানতে পারলেন চিকিৎসক আসেননি। আরেকজন প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য কয়েকবার ঘুরেও খালি হাতে ফিরেছেন। কোথাও আবার সেবা পাওয়ার আগে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দেওয়ার চাপ, কোথাও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য। স্বাস্থ্যসেবার এসব অভিজ্ঞতা শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার গল্প নয়; এগুলো এমন এক বাস্তবতা, যেখানে সেবার মান নির্ধারিত হয় না কেবল চিকিৎসক বা ওষুধের প্রাপ্যতায়, বরং নির্ধারিত হয় সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে।

নীলফামারী সচেতন নাগরিক কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক উপ-কমিটির আহ্বায়ক মো. মিজানুর রহমান লিটু যখন মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন, তখন আলোচনায় বারবার ফিরে আসছিল একই প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই তার প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে? তার কথা শেষ হতেই লক্ষ্মীপুর সচেতন নাগরিক কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম নিজের জেলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সেখানে অনেক রোগীকেই সেবা নিতে গিয়ে দালালচক্রের হয়রানির শিকার হতে হয়। এরপর আর আলোচনা একটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার বক্তব্যের পর একে একে অন্য অংশগ্রহণকারীরাও কথা বলতে শুরু করেন। জেলা ভিন্ন হলেও অভিজ্ঞতার মধ্যে ছিল বিস্ময়কর মিল। কোথাও চিকিৎসক সময়মতো নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট, কোথাও আবার সেবা পাওয়ার পথ আটকে দেয় অনিয়ম আর মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। সেই অভিজ্ঞতার তালিকায় রাজধানীর সরকারি হাসপাতালও বাদ যায়নি।

অথচ বাংলাদেশ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, পরিবার পরিকল্পনা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাফল্য স্বীকৃত। কিন্তু এই অর্জনের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। প্রশাসনিক দুর্বলতা, জবাবদিহির ঘাটতি, সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং অনিয়মের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারী এবং কিশোরীরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক জাতীয় খানা জরিপও এই বাস্তবতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। জরিপ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ৬৪.৪ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে; প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সেবাগ্রহীতাকে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়েছে। এসব অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, বরং মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের পথকেও দুর্বল করে দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় শুদ্ধাচার ও জবাবদিহি শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে টিআইবি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল হেলথের কৌশলগত সহায়তা এবং সুইডিশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত "Strengthening Integrity and Accountability in Sexual and Reproductive Health Systems in Bangladesh" প্রকল্পটি শুরু হয়েছে লক্ষ্মীপুর ও নীলফামারীর ১৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্রকে ঘিরে। তবে প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য কেবল সমস্যা চিহ্নিত করা নয়; বরং সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতাকে প্রমাণভিত্তিক তথ্য হিসেবে তুলে এনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমাধানের পথ তৈরি করা।

এই উদ্যোগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাস্তব চিত্র নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন প্রশিক্ষিত নারী কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটররা। ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়, ওষুধের প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি, সেবায় বৈষম্য এবং বাজেট বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরে সেই তথ্য স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যাতে সমস্যা শুধু নথিবদ্ধ না থেকে সমাধানের দিকেও এগোয়।

উদ্বোধনী আয়োজনে অংশ নেওয়া সরকারি প্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও একমত হন যে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা বাজেটের বিষয় নয়; এটি কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সরকারের পক্ষ থেকেও প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়।

টিআইবির দৃষ্টিতে, ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পথ শুরু হয় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে। কারণ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয় নয়; এটি নারীর অধিকার, মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহিরও প্রশ্ন। আর সেই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসা একজন নারীকে আর ভাবতে হবে না—আজ তিনি চিকিৎসক পাবেন কি না, প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলবে কি না, কিংবা সেবা পেতে অতিরিক্ত মূল্য দিতে হবে কি না। তখন স্বাস্থ্যসেবা শুধু একটি সরকারি সেবা নয়, নাগরিকের নিশ্চিত অধিকার হয়ে উঠবে।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি