প্রকাশকাল: ০৭ জুন ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনরায় নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং প্রচারণায় দেওয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারপ্রধান একাধিকবার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থান ও এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের মৌলিক প্রত্যাশা ছিল একটি সুশাসিত, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ— আর সেই প্রত্যাশার বিপরীতে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রগতি যাচাই করতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের প্রথম ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন” র্শীষক পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে। গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের শাসনব্যবস্থার বর্তমান গতিপথ সম্পর্কে একটি মিশ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে।
টিআইবি পরিচালিত গবেষণায় সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার মূল্যায়নে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের প্রমাণ পেয়েছে — পাশাপাশি চিহ্নিত করেছে এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, যা অর্থবহ সংস্কারের পথে এখনও বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারপ্রধান একাধিকবার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এরই পাশাপাশি, ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিকে সরকারের কিছু পদক্ষেপ জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। নতুন সরকার শুরুতেই বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে যা অতীতের পরিচিত ধারা থেকে আলাদা বলে মনে হয়েছে। যেমন, সংসদ সদস্যদের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে, ভিভিআইপি প্রটোকল কমানো হয়েছে, পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনায় রাষ্ট্র চালানোর সম্ভাবনা যেনো একটু হলেও দৃশ্যমান হয়েছিলো। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মুদ্রাস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট, জনস্বাস্থ্যের চাপ — এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। টিআইবির পর্যালোচনা এই প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানায়। সংসদের প্রথম অধিবেশনেও তুলনামূলক সক্রিয়তা ছিল — প্রশ্নোত্তর পর্বে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রশ্নের জবাব মিলেছে, বিতর্কে অংশগ্রহণ হয়েছে। এসব মিলিয়ে জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে পরিবর্তন সম্ভব।
তবে টিআইবির পর্যবেক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জায়গায় বৈপরীত্য দেখা গিয়েছে। বেশকিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে যেসব গভীর সংস্কার প্রয়োজন, তার অনেকটাই এখনও অসম্পূর্ণ অথবা অনিশ্চিত। যেমন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জায়গায় এই বৈপরীত্য সবচেয়ে প্রকটভাবে ধরা পড়েছে।
এই অসামঞ্জস্য শুধু নয়, প্রতিষ্ঠান পরিচালনাতেই নয় — আইন প্রণয়নেও দেখা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি আইনে পরিণত করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। তবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন ও গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত যে আইনগুলো সামান্য সংশোধনেই টিকিয়ে রাখা যেত, সেগুলো "আরও পর্যালোচনার" সুযোগ আছে বলে বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। অথচ একই সময়ে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব বাড়ায় এমন আইন পাস হয়েছে অনায়াসে। টিআইবির দৃষ্টিতে এই দুটি প্রবণতা একসঙ্গে দেখলে সংস্কার, অঙ্গীকার আর বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে একটি অস্বস্তিকর অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরই পাশাপাশি, প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার ছবিটাও উদ্বেগজনক। প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশন পুনর্গঠনে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এই তিনটি প্রতিষ্ঠান কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে থাকলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার কাজ কীভাবে এগোবে — সে প্রশ্ন থেকেই যায়। টিআইবি পর্যবেক্ষণ করেছে যে, সরকারের কর্মসূচির মূলধারায় সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কৌশলকে যুক্ত করতে না পারলে ঘোষিত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে সদিচ্ছার ঘোষণা আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে যে ফাঁকটা, সেটি আসলে একটি পরিচিত সংস্কৃতির প্রকাশ — "এবার আমাদের পালা।" পুলিশ, প্রশাসন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান — সর্বত্র দলীয় ও গোষ্ঠী বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়ন অব্যাহত রয়েছে বলে টিআইবির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে কঠোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার কথা বলা হয়েছে — কিন্তু হাট-বাজার, বাস স্ট্যান্ড, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও ছিনতাই বহাল তবিয়তে চলছে। এমনকি একজন মন্ত্রীর চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংসদীয় কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও জনমনে একই প্রশ্নের উদয় হয়েছে। সংসদ সক্রিয় দেখালেই প্রকৃত সংসদীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় না। বেশিরভাগ সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করেনি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অধরা। আর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে।
আবার, আর্থিক খাতের ছবিটা আরও জটিল। ব্যাংকিং সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আছে, ব্যাংক রেজোলিউশন আইন ২০২৬ নিয়ে বিতর্ক আছে, ঋণ পুনঃতফসিলের চলমান সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ আছে। সাইবার সিকিউরিটি আইন ২০২৬-এর বিতর্কিত ধারাগুলোর অপব্যবহারের আশঙ্কাও কমেনি। উপরন্তু, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আর্কাইভে সরিয়ে দেওয়ায় সাধারণ নাগরিকের তথ্য পাওয়ার পথ আরও সংকুচিত হয়েছে।
প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগের ঘাটতি দেখা যাওয়ার পাশাপাশি নাগরিক পরিসরেও চাপ বা অনিয়ম অব্যাহত আছে। এছাড়া, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দ্রুত প্রত্যাহার আর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলার অব্যাহত অস্তিত্ব — এই দুটি বিপরীতমুখী প্রবণতা একসঙ্গে দেখলে "যোগ্যতাভিত্তিক শাসন" ও "নিরপেক্ষ বিচার" প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এবং জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে ধর্মান্ধ শক্তিগুলোর উত্থান ঘটেছিলো, বৈচিত্র্য ও সহনশীলতার বিরুদ্ধে যে সহিংস কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিলো — সেই ধারা নির্বাচিত সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহ আলীর মাজারে আর কুষ্টিয়ায় একজন পীরের উপর হামলা সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ নজির। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানি, মামলা ও ভীতি প্রদর্শন চলছে। হত্যা, অপহরণ, নারী ও শিশুর উপর সহিংসতা, জমি দখল — এই পরিচিত সংকটগুলো গত ১০০ দিনে ঘটার ফলে আমাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে বৈচিত্র্য ও সহনশীলতার প্রশ্নটি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এখনও কতটা ভঙ্গুর।
সামগ্রিকভাবে টিআইবির মূল্যায়ন আমাদের সামনে একটি মিশ্র চিত্র উপস্থাপন করে। এতো কিছুর মধ্যেও টিআইবি সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাফল্য বা ব্যর্থতার কোনো একটি ছাঁচে ফেলতে রাজি নয়। টিআইবির পর্যালোচনার সামগ্রিক বার্তা এটাই যে, সময়টি একইসঙ্গে আশাজাগানিয়া এবং উদ্বেগজনক। কিছু পদক্ষেপ প্রত্যাশা তৈরি করেছে, কিন্তু জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার পথে প্রাতিষ্ঠানিক, আইনি ও প্রক্রিয়াগত বাধাগুলো এখনো সামনে পড়ে আছে। জনআস্থা ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার অঙ্গীকার শুধু কাগজে কলমে নয় সরকারকে তা ধারাবাহিকভাবে কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে। টিআইবি এটাও মনে করে, সরকারের সংস্কার-পরিকল্পনার প্রকৃত পরীক্ষা আসলে শুরু হবে এখন থেকে —আগামী কয়েক মাস প্রথম ১০০ দিনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।