বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশে পশ্চাদপসরণের ইঙ্গিত: টিআইবি

প্রকাশকাল: ০৯ এপ্রিল ২০২৬

সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

১৩তম জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ—যথা সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ—রহিত করার সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন, তথ্য অধিকার এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা সংশোধনের সরূপ কি হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্টতা ছাড়াই “পরবর্তী পর্যালোচনার” অজুহাতে স্থগিত রাখা হয়েছে বলে ০৬ এপ্রিল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করে।

সম্প্রতি ১৩তম জাতীয় সংসদের একটি বিশেষ কমিটি ১৩৩টির মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ আইন হিসেবে প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। তবে টিআইবির মতে, এসব অধ্যাদেশ ত্রুটিমুক্ত নয় এবং কিছু ক্ষেত্রে এগুলোকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গুরুতর ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও এবং বাতিলযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫- এ অধিকতর সরকারি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকারী বিধান সংযোজন করে বিল আকারে পাস করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা হতাশাজনক।

নিম্নে অধ্যাদেশসমূহ সম্পর্কে টিআইবির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরা হলো:

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দেখা যায়, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছিল বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং দলীয় রাজনৈতিক ও সরকারি প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে। এ অধ্যাদেশ অনুযায়ী সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল রাষ্ট্রপতির নিকট যোগ্য প্রার্থীদের সুপারিশ করে। এর মাধ্যমে হাইকোর্ট বিভাগে এক দফা নিয়োগও সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ অধ্যাদেশ রহিত হলে বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনরায় পূর্বের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বা সরকার প্রধানের ইচ্ছানির্ভর হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে—যা কার্যত এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পেছনে যাওয়ার শামিল বলে মনে করে টিআইবি।

মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ

এক্ষেত্রে টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং গুম প্রতিরোধে প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো উদ্বেগজনক। বিশেষ করে কমিশনের প্রশাসনিক স্বাধীনতা সীমিত করা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার মতো বিধানগুলো উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫

টিআইবির সুপারিশ হলো, জুলাই সনদ এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মত সুপারিশের আলোকে অধ্যাদেশটি সংশোধন করে দ্রুত আইনে পরিণত করা হোক। মূল উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে স্বাধীন বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি বাদ দেওয়া, দুর্নীতি মামলায় আপোষের সুযোগ রেখে স্ববিরোধী ধারা সংযোজন, কমিশনারদের অভিজ্ঞতার শর্ত বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকে আইনের আওতার বাইরে রাখা। এছাড়া, সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতার অপব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা, দুর্নীতিবিরোধী ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিরসন আইন প্রণয়ন, বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনা, CRS ও OGP-এ অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

তথ্য অধিকার (সংশোধন) আইন, ২০২৫

প্রস্তাবিত আইনে তথ্যের সংজ্ঞায় নোটশিট অন্তর্ভুক্ত করা, কর্তৃপক্ষের আওতা বৃদ্ধি, সরকারি চুক্তির আওতায় থাকা বেসরকারি সংস্থা ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এছাড়া ৪৫ দিনের মধ্যে তথ্য কমিশনার নিয়োগ এবং তাদের পদমর্যাদা ও সুবিধা উচ্চ আদালতের বিচারকদের সমমানের করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫

এই অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের আগে মানবাধিকার প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি এবং বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে স্বাধীন হতে হবে। অধ্যাদেশটিতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উপাত্ত সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ নীতিসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একইসাথে অস্পষ্ট অজুহাতে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ এবং “অপরাধ প্রতিরোধ” বা “জাতীয় নিরাপত্তা”র নামে ব্যক্তিগত উপাত্ত ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা নজরদারি ও অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬

এই অধ্যাদেশে ‘ওটিটি’ ও ‘কনটেন্ট’ অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি করে।

সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫

এই অধ্যাদেশে কিছু মৌলিক ঘাটতি রয়েছে যা মহা হিসাব-নিরীক্ষকের সাংবিধানিক স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। রাজস্ব নিরীক্ষার পূর্ণ ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ, বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা এবং সংসদীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫

এই অধ্যাদেশে এনবিআর পুনর্গঠন করা হলেও, টিআইবি মনে করে, তা যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই করা হয়েছে, যার ফলে রাজস্ব খাতে অস্থিরতা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীন রাজস্ব কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিবর্তে এটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫

এই অধ্যাদেশ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনে ব্যর্থ হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের বিপরীত। এর কাঠামো, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও কার্যপরিধি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যা সরকারি ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং কমিশনের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করে।

জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫

এই অধ্যাদেশে প্রস্তাবিত কর্তৃপক্ষ একইসাথে নিয়ন্ত্রক ও সেবা প্রদানকারী হিসেবে কাজ করবে, যা স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রভাবের কারণে এর স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ এবং ডেটা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি