তরুণদের হাত ধরেই সুশাসনের ভবিষ্যৎ: নাগরিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে টিআইবির উদ্যোগ

প্রকাশকাল: ২৩ জুন ২০২৬

কুষ্টিয়ার একটি মিলনায়তনে শতাধিক তরুণের সামনে দাঁড়িয়ে সচেতন নাগরিক সমাজ (সনাক), কুষ্টিয়ার সভাপতি আসমা আনসারী মিরু একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন —“আইনের শাসন নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই।” কথাটি নতুন না হলেও এ কথাটি সেদিন উপস্থিত তরুণদের মাঝে কেবল একটি বক্তব্য হিসেবেই নয়, বরং নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।

বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনায় সুশাসনের প্রশ্নটি বারবার সামনে আসে। কারণ দুর্নীতি, জবাবদিহিতার ঘাটতি কিংবা তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনকেই প্রভাবিত করে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় সরকার কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দৃশ্যমান। তাই শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই নয়, বরং নাগরিক হিসেবে কীভাবে পরিবর্তনের অংশ হওয়া যায়, সেই ভাবনা ছড়িয়ে দিতেই দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালের মে মাসে টিআইবি স্থানীয় সনাক এবং ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস) গ্রুপগুলোর সহযোগিতায় কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা ও মধুপুরে আয়োজন করে “টেকসই উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন: তরুণ সংগঠকদের ভূমিকা” শীর্ষক কর্মশালা। উক্ত কর্মশালায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক ও আদিবাসী বিভিন্ন সংগঠনের দু’শতাধিকেরও বেশি তরুণ প্রতিনিধি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তরুণদের কাছে সুশাসনকে কেবল একটি নীতিগত ধারণা হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বাস্তব বিষয় হিসেবে তুলে ধরা। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), তথ্য অধিকার আইন (আরটিআই) ২০০৯ এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার বিভিন্ন মাধ্যমের সাথে।

টিআইবির সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের সমন্বয়কারী কাজী শফিকুর রহমান ও মো. আতিকুর রহমান কর্মশালাগুলো পরিচালনা করেন। তাঁরা উপস্থিত তরুণদের সামনে তুলে ধরেন এমন একটি ধারণা, যেখানে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান শুধু প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তথ্য জানার অধিকার, নাগরিক অংশগ্রহণ, সামাজিক জবাবদিহিতা এবং ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমেও পরিবর্তন সম্ভব।

দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মশালাগুলো অনুষ্ঠিত হলেও আলোচনার কেন্দ্রে ছিল একই প্রশ্ন —কীভাবে আরও দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়ে তোলা যায়। স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী আলোচনার ধরন ভিন্ন ছিল, কিন্তু উপস্থিত তরুণদের ভাবনায় বারবার ফিরে এসেছে সুশাসনের প্রয়োজনীয়তা। যেমন কুষ্টিয়ার কর্মশালায় উঠে এসেছে দারিদ্র্য নিরসনের সঙ্গে সুশাসনের সম্পর্ক। অন্যদিকে যশোর ও খুলনার কর্মশালায় গুরুত্ব পায় নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। সাতক্ষীরায় দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগকে আরও সংগঠিত করার আহ্বান ওঠে, আর মধুপুরে অংশগ্রহণকারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

কর্মশালার এই আলোচনাগুলো শুধু অংশগ্রহণকারী তরুণ প্রতিনিধিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। কর্মশালায় উপস্থিত স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরাও তরুণদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সাতক্ষীরা সনাক-এর সদস্য ও ইয়েস উপ-কমিটির আহ্বায়ক মো. ওলিউর রহমান বলেন, “তরুণরাই সবসময় ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হয়ে থেকেছে, এবং দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়তে তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।”

খুলনা সনাক-এর ও সদস্য ইয়েস উপ-কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর আনোয়ারুল কাদির স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গঠনে তরুণদের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করেন। মধুপুর সনাক-এর সভাপতি মো. বজলুর রশিদ খান এসডিজি অর্জনে সরকার, নাগরিক সমাজ ও জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. হামিদুর রহমান তরুণ-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগকে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

কর্মশালাগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়। তরুণ প্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার সুশাসন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করেন এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়েও মতবিনিময় করেন। ফলে কর্মশালাগুলো কেবল প্রশিক্ষণ নয়, বরং তরুণদের জন্য একটি যৌথ শেখার ও ভাবনার বিস্তারিত পরিসর তৈরি করে।

প্রতিটি কর্মশালার সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীরা দুর্নীতিবিরোধী শপথ গ্রহণ করেন। তবে এই অঙ্গীকারের গুরুত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। এটি এমন এক প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি, যারা নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংগঠন এবং সম্প্রদায়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের চর্চা আরও শক্তিশালী করতে চায়।

মোট ১০১টি শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও আদিবাসী সংগঠনের ২৩৮ জন তরুণ প্রতিনিধি এই কর্মশালা-সিরিজে অংশগ্রহণ করেন। তাঁরা এখন নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন নতুন ভাবনা, নতুন সংযোগ এবং নতুন অঙ্গীকার নিয়ে।

টিআইবির বিশ্বাস, দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন একদিনে গড়ে ওঠে না। এটি তৈরি হয় সচেতন নাগরিক, সক্রিয় তরুণদের অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক সামাজিক সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের এই সম্পৃক্ততা তাই শুধু কয়েকটি কর্মশালার সাফল্যের গল্প নয়; বরং আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক বাংলাদেশ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি যাত্রার অংশ।

সেই অর্থে কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা ও মধুপুরের তরুণ প্রতিনিধিদের এই অঙ্গীকার কোনো কর্মশালাকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ আর থাকেনি। বরং টিআইবি আশা করে তা ছড়িয়ে পড়বে তাঁদের ক্যাম্পাসে, সংগঠনে এবং সমাজে — যেখানে প্রতিদিনের ছোট ছোট উদ্যোগই ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করবে।