প্রকাশকাল: ২০ মে ২০২৬
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত কর্মশালায় সেদিন জড়ো হয়েছিল একদল তরুণ। কেউ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, কেউ নোট নিচ্ছিল, কেউ আবার আলোচনার ফাঁকে নিজের অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিচ্ছিল পাশের জনের সঙ্গে। চারপাশে ছিল পরিচিত ক্যাম্পাসের পরিবেশ, কিন্তু আলোচনার বিষয়গুলো ছিল অনেক বড়—সুশাসন, দুর্নীতি, নাগরিক দায়বোধ এবং সমাজে পরিবর্তনের সম্ভাবনা।
আলোচনায় উঠে আসছিল এমন এক বাস্তবতার কথা, যেখানে অনেক সময় সাধারণ মানুষ সেবা পেতে ভোগান্তির মুখোমুখি হন, প্রভাব ছাড়া সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, আর ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায় সামাজিক আস্থা। তবে কথোপকথনে হতাশার চেয়ে বেশি ছিল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।
“টেকসই উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন: তরুণ সংগঠকের করণীয়”শীর্ষক কর্মশালাটির আয়োজন করে টিআইবি’র সিটিজেন এনগেজমেন্ট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর ইয়েস গ্রুপ, রংপুর। বিভিন্ন তরুণ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা সেখানে অংশ নেন।
আলোচনায় দুর্নীতি প্রতিরোধ, তথ্য অধিকার আইন, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক উঠে আসে। তবে আনুষ্ঠানিক আলোচনার বাইরেও পরিবেশজুড়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল আরেকটি বিষয়—সমাজকে শুধু সমালোচনা করে দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে চায় না তরুণদের একটি অংশ; বরং পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে চায় তারা।
টিআইবির সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের সমন্বয়ক মো. আতিকুর রহমান আলোচনায় বলেন, “টেকসই উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ।” তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে তথ্য অধিকার আইন এবং নাগরিক সচেতনতার গুরুত্ব।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, “দুর্নীতি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক আস্থাকেও দুর্বল করে।” তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একটি দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে নতুন প্রজন্মের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কর্মশালাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অংশগ্রহণকারী তরুণদের আন্তরিকতা। কেউ শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন, কেউ রক্তদান কার্যক্রমে, কেউ পরিবেশ বা সামাজিক সচেতনতা নিয়ে। আলাদা করে দেখলে উদ্যোগগুলো হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক নতুন সামাজিক প্রবণতা—দুর্নীতিকে আর স্বাভাবিক বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয় নতুন প্রজন্মের একটি অংশ।
রংপুরের সেই আলোচনার রেশ কয়েকদিন পর পৌঁছে যায় বগুড়াতেও।
সরকারি আজিজুল হক কলেজে আয়োজিত আরেকটি কর্মশালায়ও ফিরে আসে প্রায় একই ধরনের প্রশ্ন—দুর্বল জবাবদিহিতা, সামাজিক আস্থার সংকট এবং নাগরিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ বলেন, দুর্নীতি শুধু ব্যবস্থার ভেতর টিকে থাকে না; অনেক সময় সমাজের নীরব গ্রহণযোগ্যতাও সেটিকে টিকিয়ে রাখে।
আলোচনার এক পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীদের কয়েকজন মত দেন, অসৎ উপায়ে অর্জিত সাফল্যকে সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সংস্কৃতি বদলানো না গেলে শুধু আইন দিয়ে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মাহফুজুল ইসলাম তরুণদের উদ্দেশে বলেন, “নিজেদের শুধু শিক্ষিত নয়, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।” তাঁর মতে, সামাজিক পরিবর্তনের জন্য সচেতন তরুণ সমাজের বিকল্প নেই। পুরো আয়োজনজুড়ে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে আরেকটি বিষয়—নাগরিক দায়িত্ব, সততা এবং সামাজিক জবাবদিহিতার প্রশ্নটি নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে তরুণদের একটি অংশ।
বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা অনেক সময় নীতি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু রংপুর ও বগুড়ার এই আয়োজনগুলো মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তনের শুরুটা সামাজিকও হতে পারে—ক্যাম্পাসে, কমিউনিটিতে, কিংবা প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণের মধ্য দিয়ে।
কর্মশালার শেষে অংশগ্রহণকারীরা একসঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী শপথ নেন যা ছিল একদল তরুণের শান্ত কিন্তু দৃঢ় অঙ্গীকার—নিজেদের অবস্থান থেকে আরও দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক এবং স্বচ্ছ সমাজ গড়ে তোলার পথে সক্রিয় থাকার অঙ্গীকার!