প্রকাশকাল: ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) বাতিল হলেও সাংবাদিকরা এখনো কেন আতঙ্কিত? সকালের অধিবেশনে শ্রোতাদের মধ্য থেকে একজন এই প্রশ্ন করলেন। প্যানেল আলোচকদের কেউ এই প্রশ্নের পেছনের যে বাস্তবতা তার বিরোধিতা করলেন না। গত ২৮ এপ্রিল ঢাকার বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘ড্রাপ্যাক ২০২৬’ জাতীয় সম্মেলনের পুরো আবহ মূলত এই একটি প্রশ্নেই ধরা পড়েছে। কোনো পরিসংখ্যান বা আইনি যুক্তির চেয়ে উক্ত জিজ্ঞাসাটিই ছিল বেশি প্রাসঙ্গিক ।
প্রশ্নটির উত্তরে আলোচকদের মতামত হলো, আইন পরিবর্তন, বাতিল অথবা সংস্কার হলেও আইনের পুরোনো ধারাগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসাই হলো মূল সমস্যা। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু ডিএসএ-র অধীনেই সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এই তালিকায় ছিলেন রাজনীতিক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। মানুষ সভায় মোবাইল ফোন নিয়ে যেতে ভয় পেত। জনপরিসরে ভয়ের এক ভারী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি ছিল মানুষের চিন্তা ও চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের একটি বড় হাতিয়ার। শেষ পর্যন্ত আইনটি বাতিল হলেও নীতিনির্ধারকরা এর দমনমূলক উপকরণগুলো কৌশলে নতুন আইনে ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
‘ডিজিটালি রাইট’ এবং ‘এনগেজ মিডিয়া’ আয়োজিত ‘ড্রাপ্যাক ২০২৬’ এ সেশন পার্টনার ছিল টিআইবি ও ডি-নেট। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘অর্থবহ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আইন প্রণয়ন’। তবে দিনভর আলোচনায় এক রূঢ় বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশে এখন নতুন যেসব ডিজিটাল আইন পাস হচ্ছে, সেখানে নিপীড়নের কাঠামোটি কেবল নাম বদলে ফিরে আসছে। সাইবার নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে করা এসব আইন আদতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে খর্ব করছে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট ভাষায় নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, টেলিযোগাযোগ সংশোধন অধ্যাদেশ বা তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, কোনোটিই ডিএসএ পরবর্তী সময়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। এগুলো আসলে পুরোনো আইনেরই রূপান্তর। সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের সুযোগ এখানে নেই বললেই চলে। ড. জামান আরও বলেন বর্তমান সংসদীয় নেতৃত্বের অনেকেই অতীতে এসব আইনের অপব্যবহারের শিকার হয়েছিলেন অথচ তারাই আবার একই ধরনের আইন করেছেন। এই অসংগতি মেনে নেওয়া কঠিন। বর্তমান ডিজিটাল কাঠামোর নীতিনির্ধারকদের অনেকেই একসময় এই ধরনের আইনের কারণে নির্যাতিত হয়েছিলেন। অথচ নতুন আইনেও মানুষের ব্যক্তিগত ডিভাইসে প্রবেশের অবাধ ক্ষমতা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল নজরদারির পরিকাঠামো আগের মতোই বহাল আছে। প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এসব আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, এই ধারাগুলো জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা ও নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী।
দ্য ডেইলি স্টারের যুগ্ম সম্পাদক আশা মেহরীন আমিন দর্শকদের অস্বস্তিকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন। তিনি জানান সরকার বদলালেও ফেসবুক পোস্ট নিয়ে মামলার হার কমেনি। সাংবাদিকরা আগের মতোই নজরদারির ঝুঁকিতে আছেন। আইনের নাম বদলেছে কিন্তু ভয়ের পরিবেশ বদলায়নি।
আইনের বিষয়বস্তুর বাইরে এর প্রণয়ন পদ্ধতি নিয়েও বড় সংকট আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যাপ্ত মতামত ছাড়াই এসব খসড়া তৈরি করেছিল। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও একই রকম তাড়াহুড়ো করে আইনগুলো পাস করেছে। প্রতিবারই পুরোনো অধ্যাদেশের ভুলগুলো নতুন আইনেও রয়ে গেছে। এতে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ দুর্বল হয়েছে। দ্রুত আইন করার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ একটি বড় সুযোগ নষ্ট করেছে।
ইউনেস্কোর প্রতিনিধি সুজান ভাইজ বলেন সরকারের উচিত এই পরিস্থিতিকে একটি প্রকৃত সুযোগ হিসেবে দেখা। সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে এই আইনগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিত বলে তিনি পরামর্শ দেন।
তবে হতাশাজনক বিষয় হল সরকারের পক্ষ থেকে আসা গতানুগতিক উত্তর। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহম্মদ আনোয়ার উদ্দিন আইনগুলোকে প্রয়োজনীয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, কোনো ত্রুটি থাকলে তা পরে সংশোধন করা যাবে।
নাগরিক সমাজ গত কয়েক বছর ধরে এই একই আশ্বাস শুনে আসছে। ডিএসএ অনুমোদনের সময়ও ঠিক এই কথাগুলোই বলা হয়েছিল। আদতে মৌলিক সংস্কার ছাড়া সামান্য মেরামতে কোনো কাজ হয় না। আইনের গোড়াতেই যদি নজরদারির সুযোগ থাকে, তবে ওপর ওপর ঘষামাজায় তার মূল চরিত্র বদলায় না।
পরের দিকের অধিবেশনগুলোতে আলোচনার পরিধি আরও বাড়ে। মেটা, টেলিনর এশিয়া এবং স্থানীয় স্টার্টআপ শেয়ারট্রিপের প্রতিনিধিরা তাদের উদ্বেগের কথা জানান। সবারই অভিযোগ এক—নীতিমালা তৈরির সময় তাদের কথা শোনা হয় না। আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো ডেটা লোকালইজেশন নিয়ে সংকটে আছে। টেলিকম অপারেটররা নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। বিটিআরসি কমিশনার অকপটে এই বৈষম্যের কথা স্বীকার করলেন। প্রভাবশালীরা খুব সহজে নীতিনির্ধারকদের কাছে যেতে পারেন, অন্যরা পারেন না। এতে জনআস্থা নষ্ট হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা মিরাজ আহমেদ চৌধুরী সমাপনী বক্তব্যে একটি অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরে বলেন বাংলাদেশে ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা এখনো মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এই ক্ষেত্রটি সবার, শুধু সরকার বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একার নয়। এখানকার আলোচনা কেবল সম্মেলন কক্ষের ভেতরে আটকে রাখলে চলবে না।
অংশগ্রহণকারীরা যার যার মতো অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। সাংবাদিকরা জানলেন, তাদের পেশাগত ঝুঁকি এখনো কাটেনি। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নতুন ভাষায় দাবি তোলার সাহস পেলেন। তাড়াহুড়ো করে আইন করা যে কোনো সমাধান নয়, সেই যুক্তি আরও জোরালো হলো। তরুণ ফেলোরা প্রথমবারের মতো নীতিনির্ধারকদের সামনে তাদের গবেষণার ফল তুলে ধরার সুযোগ পেলেন।
সকালের অধিবেশনে একজন জানতে চেয়েছিলেন কেন সাংবাদিকরা এখনো ভয় পান। এই প্রশ্নটি কেবল তার একার নয়। পরিবর্তনের শুরুটা আসলে এভাবেই হয়। জনাকীর্ণ ঘরে সবার সামনে প্রশ্নটি করতে পারাই হলো পরিবর্তনের প্রথম ধাপ।