প্রকাশকাল: ১০ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের ভূমি সেবা খাতটি দীর্ঘকাল ধরে জনরোষ এবং দুর্নীতির এক জটিল আবর্তে আটকে আছে। একদিকে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি আর অন্যদিকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সীমাবদ্ধতা। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভূমি প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে যারা সরাসরি জনগণের ভূমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করেন সেই সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ডদের অগ্রাধিকার দিয়ে টিআইবি তার কার্যক্রমকে বেগবান করছে কারণ এই কর্মকর্তারাই সরাসরি সাধারণ মানুষের সাথে সরকারের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে ১১ নভেম্বর টিআইবির ঢাকা কার্যালয়ে ৪৪ জন এসি ল্যান্ডের অংশগ্রহণে একটি বিশেষ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা ভূমি অফিস সেবা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় শীর্ষক এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক বাস্তবতার সাথে জাতীয় নীতি সংস্কারের একটি সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করা। টিআইবি বিশ্বাস করে যে তৃণমূলের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ছাড়া নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে টেকসই কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়। কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন টিআইবির সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ফারহানা ফেরদৌস এবং সেখানে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তারা তাদের প্রাত্যহিক কাজের নানা প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতার কথা সরাসরি নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরেন। আলোচনায় উঠে আসে তীব্র জনবল সংকট এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব যা সেবাপ্রদান প্রক্রিয়াকে ধীরগতির করে তোলে। এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিরোধ নিষ্পত্তি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করার সময় কর্মকর্তাদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা না থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। মাঠের প্রকৃত সংকটগুলো চিহ্নিত করে সঠিক সমাধান সূত্র বের করতে টিআইবির দীর্ঘদিনের গবেষণা এবং সরকারি ডিজিটাল উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি মতবিনিময় করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। তিনি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন বহুগুণ বেড়েছে। নামজারি থেকে শুরু করে প্রতিটি ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য কারণ সেবা দিতে ব্যর্থ হলে সরকারের ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হয়।
টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান কর্মকর্তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, "অন্যান্য সেক্টরের মতো ভূমি খাতেও সুশাসনের ঘাটতি এবং দুর্নীতি রয়েছে। কিন্তু যদি প্রতিটি এসি ল্যান্ড তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন, তবে সেবার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। আপনাদের মধ্যে অনেকেই ইতিমধ্যে সততার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং সেই উদাহরণগুলো আরও বৃদ্ধি পেতে হবে।"
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ. এস. এম. সালেহ আহমেদ কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দেন যে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভোগী হিসেবে তাদের প্রতিটি কাজে বিবেক ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দেওয়া সাংবিধানিক দায়িত্ব। তিনি কর্মকর্তাদের আরও সংবেদনশীল হয়ে নাগরিকদের সেবা করার পরামর্শ দেন। দিনের শেষ পর্যায়ে অংশগ্রহণকারীরা ভূমি সেবার মানোন্নয়নে কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কারের প্রস্তাব দেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল কর্মকর্তাদের জন্য ইনসেনটিভ বা প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু করা এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
টিআইবির এই উদ্যোগ কেবল একটি আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কর্মকর্তাদের তুলে ধরা প্রতিটি চ্যালেঞ্জ এবং কর্মকর্তাদের প্রস্তাবিত সমাধানগুলো নিয়ে টিআইবি বর্তমানে একটি পলিসি ব্রিফ তৈরি করছে। এই তথ্যবহুল নথিটি পরবর্তীতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাথে অ্যাডভোকেসি বা নীতিনির্ধারণী সুপারিশ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। টিআইবির এই কর্মতৎপরতা এটাই প্রমাণ করে যে যখন নীতি এবং মাঠপর্যায়ের মানুষের অভিজ্ঞতার সঠিক মেলবন্ধন ঘটে তখনই ভূমি সেবার মতো জটিল ও স্পর্শকাতর খাতে দীর্ঘমেয়াদি এবং ইতিবাচক প্রভাব ফেলা সম্ভব।