তথ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই

সীমানা ছাড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ

প্রকাশকাল: ২৭ অক্টোবর ২০২৫


তথ্যের নির্ভুলতা এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ কীভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, তার এক বাস্তবধর্মী প্রতিফলন দেখা গেছে ঢাকায় আয়োজিত সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক কর্মশালায়। গত ২১ -২৩ অক্টোবর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাতটি দেশের প্রতিনিধিরা সমবেত হন। মালদ্বীপ থেকে আসা আইশাথ আলসান সাদিক যখন জরিপ পদ্ধতির জটিল কারিগরি দিকগুলো বিশ্লেষণ করছিলেন, তখন তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল নিজস্ব প্রেক্ষাপটে এই পদ্ধতিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা। তিন দিনের প্রশিক্ষণ শেষে আইশাথ বলেন, “আমি অনেক প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলাম, এই তিন দিনের অভিজ্ঞতা আমার প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে।”


দুর্নীতি কোনো সীমান্ত চেনে না। কলম্বো বা ঢাকার পাসপোর্ট অফিসে ঘুষের দাবি, জাকার্তা বা কাঠমান্ডুর ভূমিনীতির অনিয়ম, কিংবা করাচির পুলিশি হয়রানি—সব দেশেই দুর্নীতির ধরণগুলো প্রায় একই রকম। কিন্তু এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলোকে যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরিসংখ্যানে রূপান্তর করা যায়, তবেই তা হয়ে ওঠে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ। এই ভাবনা থেকেই শ্রীলঙ্কা, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার নির্বাহী পরিচালক, বোর্ড সদস্য এবং গবেষকরা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে জড়ো হয়েছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং টিআই সচিবালয় ও টিআইবির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালা অংশগ্রহণকারীদের একেকজন দক্ষ তথ্য-যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তোলার পথ দেখিয়েছে।

তথ্য এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কেন?

এই কর্মশালায় তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে হাতে-কলমে কৌশলের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। টিআই-এর রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট টিমের ড. গ্যাব্রিয়েলা কামাচো গারল্যান্ড এবং মারিয়া কনস্টানজা কাস্ত্রো শিখিয়েছেন কীভাবে 'গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার' এবং 'জাতীয় খানা জরিপ'-এর মতো টুলগুলো ব্যবহার করে মানুষের অভিজ্ঞতাকে কার্যকর অ্যাডভোকেসি দলিলে রূপান্তর করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদাত হোসেন এবং টিআইবির গবেষণা পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান জরিপের কারিগরি খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দেন। টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা এম আকরাম মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। এছাড়া মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান শিকদার এবং টিআইবি রিসার্চ ফেলো নুরে আলম মিল্টন খাতভিত্তিক দুর্নীতি বিশ্লেষণ এবং ঘুষের প্রভাব নিয়ে বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন।

কর্মশালার শেষ দিনে টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এবং ডাটা ভিজুয়ালাইজার রিফাত রহমান ও কে.এম. রফিকুল আলম দেখান, ডাটা কালেকশন মানে শুধু সংখ্যা নয় বরং নীতিনির্ধারকদের সামনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে এমন জোরালো প্রমাণ তুলে ধরা ।

ঢাকার এই সম্মেলনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠার মূল কারণ ছিল এর পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের চমৎকার পরিবেশ। দুর্নীতি পরিমাপের ক্ষেত্রে টিআইবি দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে 'জাতীয় খানা জরিপ' পরিচালনা করে আসছে, যা বিশ্বজুড়েই একটি কঠোর ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত। মূলত টিআইবি-র এই বিশেষ দক্ষতা থেকে শিখতে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতাগুলো ভাগ করে নিতেই অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা এখানে জড়ো হয়েছিলেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, “বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে টিআইবি দীর্ঘ সময় ধরে সামনের সারিতে থেকে কাজ করছে। এই কর্মশালাটি আমাদের সবার জন্যই একটি যৌথ শিক্ষার ক্ষেত্র। আমরা ভবিষ্যতে এমন আরও আয়োজন দেখতে চাই, যা বিভিন্ন দেশের চ্যাপ্টারগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করবে এবং একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার পথ প্রশস্ত করবে।”

ড. ইফতেখারুজ্জামানের এই বক্তব্যের সূত্র ধরে ড.  গারল্যান্ড বলেন, “এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিটি চ্যাপ্টার নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পেয়েছে। এখান থেকে অর্জিত জ্ঞান তাদের নিজ দেশে এই নতুন আইডিয়াগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।”

অন্যদিকে, মারিয়া কনস্টানজা কাস্ত্রো এই কর্মশালার মূল লক্ষ্যটি খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, “সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র মেপে দেখা যায় তা বুঝতে আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি।” বর্তমান সময়ে যেখানে ভুল তথ্য আর বিভ্রান্তিকর গল্পের ছড়াছড়ি, সেখানে তথ্যনির্ভর লড়াই বা 'এভিডেন্স-বেজড অ্যাডভোকেসি' সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন তথ্যের মাধ্যমে অকাট্যভাবে দেখানো হয় যে—কোনো একটি নির্দিষ্ট জেলার ৬০ শতাংশ মানুষকে মৌলিক সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে, কিংবা দুর্নীতি একটি সাধারণ পরিবারের আয়ের একটি বড় অংশ কেড়ে নিচ্ছে, তখন সেই বিষয়টি আর কেবল ব্যক্তিগত অভিযোগ বা মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার মতো একটি শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই 'ডাটা-চালিত' কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাস্ত্রো আরও যোগ করেন, “আমাদের আন্দোলনের পক্ষে জোরালো এবং অকাট্য প্রমাণ নিশ্চিত করতে কর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে বিনিয়োগ করতে পেরে আমরা সত্যিই আনন্দিত।”

দৃষ্টিভঙ্গি বদলের গল্প

তিন দিনের এই সফর অনেক অংশগ্রহণকারীর পুরনো ধারণাও বদলে দিয়েছে। যেমন, ফিজির প্রতিনিধি উলাইয়াসি ওয়াকাইতানো তুইকোরো শুরুতে ভেবেছিলেন তাঁর ছোট দেশে জরিপ করা খুব সহজ। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বুঝলেন তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কতটা অপরিহার্য। তিনি এখন বিশ্বাস করেন, কেবল ভালো ইচ্ছা নয়, বরং পদ্ধতিগত উৎকর্ষই পারে দুর্নীতির সূচকে তাঁর দেশের অবস্থান উন্নত করতে। আয়েশাত সাদিকও মনে করেন, এই কারিগরি জ্ঞান তাঁদের ভবিষ্যতে আরও নির্ভুল জরিপ পরিচালনা করতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।

আগামী পথ

কর্মশালা শেষে টিআইবির উপদেষ্টা ব্যবস্থাপনা পরিছালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের অংশগ্রহণকারীদের বলেন, চ্যালেঞ্জগুলো সব দেশেই প্রায় সমান এবং টিআইবি সব সময় অন্যান্য চ্যাপ্টারগুলোর পাশে আছে।


আইসাথ সাদিক এবং উলাইয়াসি তুইকোরোর মতো প্রতিনিধিরা যখন নিজ দেশে ফিরবেন, তখন তাঁরা সাথে করে নিয়ে যাচ্ছেন নির্ভুল জরিপ করার জ্ঞান এবং আত্মবিশ্বাস। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টিআইবি যেভাবে এই গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC)-র মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতিনির্ধারণী ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে, সেই একই মডেলে এখন শ্রীলঙ্কা থেকে মালয়েশিয়া—প্রতিটি দেশে আরও শক্তিশালী দুর্নীতি প্রতিবেদন তৈরি হবে।

সমাপনী অধিবেশনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এই কর্মশালা কেবল দক্ষতা অর্জন নয়, বরং এটি ছিল একটি অভিন্ন উদ্দেশ্যে তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লড়াই করা যোদ্ধাদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ার প্রচেষ্টা। দুর্নীতি কোনো সীমান্ত চেনে না ঠিকই, তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধও এখন সব সীমান্ত ছাড়িয়ে গেছে।” তিনি টিআই সচিবালয় ও অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে ঘোষণা করেন যে, এই উদ্যোগের যাত্রা এখানেই শেষ নয়।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি