প্রকাশকাল: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
দুর্নীতি রোধ করতে হলে শুধু একটি বিশেষ দিক নয়, বরং সমগ্র ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী দুর্নীতি দমন সংস্থা এই তিন খাতের সমন্বয় নিশ্চিত করলেই টেকসই পরিবর্তন সম্ভব। বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথে এগোচ্ছে। এই প্রক্রিয়া গতিশীল করতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একদিকে সংস্থাটি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন খাতে সংস্কারের জন্য নীতিনির্ধারণী মহলে চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে তুলছে।
এর অংশ হিসেবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)–এর আন্তর্জাতিক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারপারসন ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ সম্প্রতি প্রথমবারের মত বাংলাদেশ সফরে এসে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। সফরের শেষ দুই দিনে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুস, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ড. ভ্যালেরিয়াঁ আলোচনা করেন কীভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের অর্থ পাচার রোধ করা যায় এবং বিদেশে পাঠানো অর্থ জব্দ করা সম্ভব হয়। প্রধান উপদেষ্টা বিশ্বব্যাংক ও ধনী দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যারা অর্থপাচারে সহায়তা করে তাদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। ভ্যালেরিয়াঁ বলেন, এই প্রবণতা ঠেকাতে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী হওয়া জরুরি, যেন পাচারকৃত অর্থ ধনী দেশ ও “ট্যাক্স হেভেন” হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোতে নিরাপদ আশ্রয় না পায়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান টিআইবি ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের টিআই-ইউকের সহযোগিতায় পতিত কর্তৃত্ববাদী সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিদেশি সম্পদ জব্দে সহায়তা করেছে। তিনি আরও বলেন প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের বাইরে পাচার হয়, যা সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির ফল।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে ভ্যালেরিয়াঁ একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে আদালতকে হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, যাতে তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করতে পারে। বিচারব্যবস্থাকে পর্যাপ্ত বাজেট, দক্ষ জনবল বৃদ্ধি এবং সৎ বিচারক নিয়োগের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে অতীতের অপরাধ ও নতুন দুর্নীতির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। প্রসঙ্গত, আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে টিআইবি এই বিষয়গুলো নিশ্চিতে অধিপরামর্শ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে কারণ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা দুর্নীতিবাজদের শাস্তি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অপরিহার্য।
দুদক চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে ভ্যালেরিয়াঁ দুর্নীতি দমন কমিশনের সার্বিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন। শুধু অভিযোগ তদন্ত নয়, বরং দুদক যাতে প্রতিরোধমূলক ভূমিকাও আরও সক্রিয়ভাবে পালন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ আলোচনার মূল উপজীব্য ছিলো। বৈঠকে বিদেশি অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, আইনি কাঠামো হালনাগাদ করা, প্রতিষ্ঠানটিকে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওা, যথাযথ আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে কমিশনের ভূমিকা বাড়ানোর মত বিষয়গুলো আশু করণীয় হিসেবে উঠে আসে।