সংখ্যার আড়ালে গল্প: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার শিক্ষা

প্রকাশকাল: ২৪ আগস্ট ২০২৫

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কম্পিউটার ল্যাব সেদিন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলো ৪০ জন শিক্ষার্থীর কৌতূহলে। রঙিন লেগো ব্লকগুলো প্রথমে শুধু খেলনার মতো মনে হলেও, টিআইবি আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের বুঝালেন যে প্রতিটি ব্লক একেকটি তথ্যের অংশ। একা এটি শুধুই ব্লক, একত্রে এগুলো মিলে গড়ে তোলে সম্পূর্ণ কাঠামো। ঠিক তেমনভাবে, তথ্যের ছোট ছোট অংশ মিলে তৈরি হয় শক্তিশালী গল্প। লেগো দিয়ে আকৃতি তৈরি করার আনন্দের মাঝে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে তথ্য শুধু সংখ্যা নয়, এটি গল্প বলার শক্তিশালী হাতিয়ার। কাঁচা তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের আকার দেওয়ার কৌশলও তারা শিখে।

২৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে টিআইবি আয়োজন করে দিনব্যাপী তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা কর্মশালা। এতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। অভিজ্ঞ সাংবাদিক এবং তথ্য বিশেষজ্ঞরা সেশন পরিচালনা করেন। কর্মশালার বিষয়বস্তু ছিল তথ্য সংগ্রহ, তথ্য অধিকার আইন, খোলা তথ্য, তথ্য বিশ্লেষণ, ভিজুয়াল উপস্থাপনা এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কৌশল।

ফ্রিল্যান্স তথ্য সাংবাদিক মুহাম্মদ ইমরান শিক্ষার্থীদের দেখান, কিভাবে সংখ্যার আড়ালে লুকানো ধারা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের গল্পে রূপান্তরিত করা যায়। প্রতিটি তথ্যের টুকরো বড় গল্পের অংশ হিসেবে কাজ করে। তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে।

মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের পরিচয় করান খোলা তথ্যের বিশাল জগতে। তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং তা সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহার করার উপায় তারা অনুধাবন করে। রিফাত রহমান হাতে-কলমে শেখান কাঁচা তথ্যকে চার্ট, গ্রাফ এবং ভিজুয়াল গল্পে রূপান্তর করার ধাপ। শিক্ষার্থীরা সরাসরি নমুনা তথ্য নিয়ে কাজ করে এবং বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্যের ধারা ও প্যাটার্ন চিহ্নিত করে।

শিক্ষার্থীরা স্প্রেডশীট ব্যবহারের মৌলিক কৌশল আয়ত্ত করে এবং তথ্য সংগঠনের প্রাথমিক কৌশল শিখে। এছাড়া, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় টিআইবি ডেটা সাংবাদিকতা নির্দেশিকা, যা তাদের ভবিষ্যতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সহায়তা করবে।

উপাচার্য প্রফেসর রেজাউল করিম তার বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেন, সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়, এটি নাগরিক দায়িত্বও। তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনের মাধ্যমে দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা সম্ভব।

টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সঠিক তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করার অন্যতম হাতিয়ার। তিনি শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে হাতে-কলমে শেখার সুযোগকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে আহ্বান জানান।

কর্মশালার শেষের দিকে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে। তারা বুঝে যে কাঁচা তথ্য বিশ্লেষণ করে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ গল্প তৈরি করা সম্ভব। শিক্ষকেরা আশা প্রকাশ করেন, এই শিক্ষার প্রয়োগ কেবল ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ থাকবেনা, বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

দিনশেষে লেগো ব্লকগুলো শুধু আকৃতি তৈরি করে নি, শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়ার কাঠামোও তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে, তথ্য শুধুমাত্র কোনো সংখ্যা নয়, এটি সত্য উদঘাটন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার হাতিয়ার।

এই কর্মশালা প্রমাণ করেছে, যখন তথ্য এবং গল্প একত্রিত হয়, তখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণে কেবল রিপোর্ট করা নয়, শিখেছে তথ্যকে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে পরিবর্তন আনার উপায়।

 

অন্যান্য ওয়েব স্টোরি