প্রকাশকাল: ০২ জুন ২০২৫
রবিবার সকাল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এর মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জড়ো হতে শুরু করেন প্রায় ২০০ সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বৃষ্টিতে ভিজলেও তাঁদের উদ্যমে কমতি ছিল না। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশ থেকে প্লাস্টিকের বর্জ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন তাঁরা। তাদের লক্ষ্য একটাই – প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।
বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৫ উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ যৌথভাবে এই উদ্যোগের আয়োজন করে। ১ জুন ২০২৫ তারিখ অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল তরুণদের সম্পৃক্ত করা। বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধের জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের দাবিতে একটি শোভাযাত্রাও অনুষ্ঠিত হয়।
এ বছরের স্থানীয় প্রতিপাদ্য ছিল: “প্লাস্টিক দূষণ প্রতিরোধে সকলে, একসাথে, এখনই”। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনে অংশ নেন।
২০৪০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক দূষণ বন্ধের ডাক
শোভাযাত্রা শুরুর আগে প্লাস্টিক দূষণ সংকটের ভয়াবহতা জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পরিবেশ দূষণ, বিশেষ করে প্লাস্টিকের কারণে সৃষ্ট দূষণ, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী হুমকি তৈরি করছে। তিনি ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত করার জন্য শক্তিশালী আইন এবং একটি সুস্পষ্ট রূপরেখার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এর জন্য সিটি কর্পোরেশনগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষা কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সম্মিলিত পদক্ষেপ প্রয়োজন, কারণ অর্থবহ অগ্রগতি এখনও অনেক পিছিয়ে। তিনি বলেন, “এটা শুধু সরকারের ওপর ছেড়ে দিলেই চলবে না। প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে, সচেতন থাকতে হবে এবং পদক্ষেপ নিতে হবে।” দৈনন্দিন অভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তন, যেমন—প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, একটি বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। ঢাকাকে প্লাস্টিকমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি অবিলম্বে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে একা প্লাস্টিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তিনি এই আয়োজনকে পরিবেশ রক্ষায় ঐক্য এবং সম্মিলিত অঙ্গীকারের একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে প্রশংসা করেন এবং প্লাস্টিকবিরোধী আন্দোলনে জড়িত সকলকে ধন্যবাদ জানান। অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম. শহীদুল ইসলাম, স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল কাদেরও শোভাযাত্রায় বক্তব্য রাখেন।
প্লাস্টিক দূষণ: বাংলাদেশের বর্তমান সংকট
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ ২১ হাজার ২৫০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন জমা হয় ৬৪৬ টন। এই বর্জ্য নদী ও জলাশয় ভরাট করে ফেলছে, পরিবেশতন্ত্রের ক্ষতি করছে এবং ড্রেজিং খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে দুর্বল পুনর্ব্যবহার পদ্ধতির কারণে, যা একটি অনিয়ন্ত্রিত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত দ্বারা পরিচালিত। এছাড়াও জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব এবং সরকারের দুর্বল পদক্ষেপও এর জন্য দায়ী। যদিও একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগ আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ, তবে শিথিল প্রয়োগের কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না। উপরন্তু, প্রতি বছর প্রায় ১৪ লক্ষ টন ভার্জিন প্লাস্টিক রেজিন আমদানি করা হয়—যা এখন কর কমানোর কারণে আরও সস্তা—যা পুনর্ব্যবহারকে আরও নিরুৎসাহিত করছে। সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০% প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সামগ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০% কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে, অগ্রগতি এখনও অস্পষ্ট এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নগণ্য। যদিও নতুন বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) নির্দেশিকা উৎপাদকদের জবাবদিহি করার লক্ষ্যে তৈরি, তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী বাস্তবায়নের ওপর।
সারা দেশে প্লাস্টিক দূষণ বিরোধী উদ্যোগ
এই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের পাশাপাশি, টিআইবির স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক—ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস), সক্রিয় নাগরিক গ্রুপ (এসিজি) এবং সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)—বাংলাদেশের ৩৮টি জেলা এবং ৭টি উপজেলায় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করে। এর মধ্যে, ভরা বর্ষাকে উপেক্ষা করে খাগড়াছড়ি, শ্রীমঙ্গল এবং রাঙ্গামাটির সনাক মানববন্ধন করে। অন্যদিকে, খুলনার সনাক প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেয়।