মোবাইল আর্থিক সেবা খাতে উচ্চ সেবামূল্য নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য

প্রকাশকাল: ২৮ মে ২০২৫

বাংলাদেশের লক্ষ মানুষের কাছে মোবাইল আর্থিক সেবা এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। টাকা পাঠানো থেকে শুরু করে বিল পরিশোধ, সবকিছুতেই এই প্ল্যাটফর্মগুলো দিচ্ছে দ্রুত ও সহজ সমাধানের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাংকগুলোর চেয়ে অনেক বেশি সেবামূল্য নিচ্ছে এই খাত, আর এর বোঝা বইতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।

টিআইবি সম্প্রতি "মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) খাতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়" শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। এই গবেষণায় উঠে এসেছে, দুর্বল নীতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফাঁদে আটকে আছে এই খাত। এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মিলে একটি শক্তিশালী জোট তৈরি করেছে। তারা নিজেদের স্বার্থে নীতি ও তদারকি নিয়ন্ত্রণ করছে। এর ফলে বিকাশ এবং নগদ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান পুরো বাজার দখল করে নিয়েছে। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে ৮৪.৪ শতাংশ এবং ৩০.৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে এই দুটি বিশাল প্রতিষ্ঠান অন্যদের প্রতিযোগিতায় টিকতে দিচ্ছে না, গ্রাহকদের সামনেও থাকছে না তেমন কোনো বিকল্প।

২০২৪ সালে ৬ শতাংশেরও বেশি সাধারণ ব্যবহারকারী এবং ১৭ শতাংশ এজেন্ট প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাদের খোয়া গেছে সামান্য টাকা থেকে শুরু করে লক্ষ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে, এমএফএস প্ল্যাটফর্মগুলো ঘুষ, অনলাইন জুয়া এবং ব্যাপক অর্থ পাচারের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। শুধু ২০২২ সালেই এই সিস্টেমগুলোর মাধ্যমে অবৈধভাবে ৭৮০ কোটি মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে।

গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবহারকারীদের চেয়ে ৭ থেকে ১৫ গুণ বেশি সেবামূল্য দিতে হয়েছে। ব্যাংকগুলো একই ধরনের সেবার জন্য মাত্র ৬৩৯ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশের সেবামূল্য অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, বিকাশ থেকে ২৫,০০০ টাকা তুলতে খরচ হয় ৩৭২.৫ থেকে ৪৬২.৫ টাকা। অথচ পাকিস্তানে (ইজিপয়সা) এর খরচ ৩৫৫.৭ টাকা, মিয়ানমারে (ওয়েভ পে) ২৩১.৩ টাকা এবং ভারতে (ফোন পে) কোনো সেবামূল্যই লাগে না। টিআইবি আরও প্রকাশ করেছে যে, নগদের অপারেটর নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রায় ৬৪৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত ই-মানি তৈরি করেছে, যা গ্রাহকের টাকাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নগদের মাধ্যমে সরকারি ভাতা বিতরণে অনিয়মের কারণে প্রায় ২,৩০০ কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচার হয়েছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই সমস্যার মূল কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন ফাঁকফোকর এবং দুর্বল নীতিমালার সুযোগ নিয়ে এই খাতকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই দখলের কারণে সাধারণ ব্যবহারকারীরা, বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, অন্যায্য সেবামূল্য দিতে বাধ্য হচ্ছেন এবং প্রকৃত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি গ্রাহকদের সুরক্ষার জন্য জরুরি সংস্কার ও তদন্তের আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পতনের সাথে সাথে অবৈধ হুন্ডি ও অর্থ পাচার কমলেও, ঘুষ এখন এমএফএস সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে। এই খাতকে করের আওতায় আনলে দুর্নীতি ও কর ফাঁকি সনাক্ত করা সহজ হবে।

টিআইবি এই খাতের সম্পূর্ণ সংস্কারের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন, সেবামূল্যের সীমা নির্ধারণ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন আর্থিক ব্যবস্থার মধ্যে লেনদেন সহজ করা। এছাড়াও, যারা দুর্নীতির সাথে জড়িত, তাদের পদমর্যাদা নির্বিশেষে কঠোর শাস্তির আওতায় আনারও আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি