আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আহ্বান, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার

প্রকাশকাল: ১৩ মার্চ ২০২৫

"আমরা হাজার হাজার শহরবাসীর সেবা করি। শহর পরিষ্কার রাখি। তাহলে সরকার কেন আমাদের দেখবে না?" বলছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী সাইজুদ্দিন। গত ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে টিআইবি আয়োজিত কর্মশালায় তিনি এই আকুতি জানান।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীরাই রাস্তাঘাট পরিষ্কার করে ঘনবসতির এই ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখেন। অথচ, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাদের কথা কেউ ভাবে না। তাদের এই অবদানের কোনো স্বীকৃতিও মেলে না। তাদের কাজকে সম্মান জানাতে "সমন্বিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য" শীর্ষক এই কর্মশালার আয়োজন করে টিআইবি। এই আয়োজনে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পঞ্চাশজন পরিচ্ছন্নতা কর্মী অংশ নেন। প্রাণবন্ত আলোচনায় তারা তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন এবং বলেন তাদের হতাশার কথা। পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সুরক্ষার জন্য প্রটেকটিভ গিয়ার নেই, বেতন অপ্রতুল, মাতৃত্বকালীন ছুটির কোনো ব্যবস্থা নেই, নেই চাকরিরও কোনো নিশ্চয়তা।

ঢাকা দক্ষিণের আরেক পরিচ্ছন্নতা কর্মী মিল্টন সরদার বলছিলেন তাদের সামান্য বেতনে সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব। “অনেক সময় বাড়তি আয়ের জন্য অন্য কাজও করতে হয়।”

জোন-৪, ওয়ার্ড-৩৮ এর লক্ষ্মী মাররা জানান, কর্তৃপক্ষ থেকে কোনো সাবান-পানি বা পরিষ্কারক দেওয়া হয় না। নিজেদের পয়সায় কিনতে হয়। জোন-৩, ওয়ার্ড-২৮ এর পারুল আক্তার নারী কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেন এবং বলেন রাত ২টা থেকে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। এ সময় নারী কর্মীরা নানা রকম হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

এত কষ্টের মাঝেও পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা আধুনিক চিন্তাভাবনার পরিচয় দেন। তারা তাদের নারী সহকর্মীদের বিশেষ প্রয়োজনের কথা বোঝেন। মোহাম্মদ সাইজুদ্দিন বলেন, "নারী পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য বাড়তি কিছু সুবিধা দরকার। যেমন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, রাতের শিফটে নিরাপত্তা, আর প্রয়োজন কর্মস্থলে শৌচাগারের ব্যবস্থা। কেন না তারা তো আমাদের সহকর্মী। বিপদে-আপদে পরিবারের আগে তারাই ছুটে আসে। তাই তাদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব আমাদেরই।"

কর্মশালায় আলোচনার এক পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই। সাইজুদ্দিন বলেন, "আমাদের ইউনিয়ন বা সিটি কর্পোরেশনের সুপারভাইজাররা কেউই এসব বিষয় নিয়ে কোনোদিন গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি।"

কর্মশালার শেষভাগে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা তাদের কাজের পরিবেশ মূল্যায়ন করেন। নিরাপত্তা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, ন্যায্য নিয়োগ, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা আর দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ – এই বিষয়গুলোকেই তারা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করেছেন। তাদের এই মূল্যায়ন বুঝিয়ে দেয় বর্তমান ব্যবস্থায় তারা কতটা অসন্তুষ্ট।

বিদ্যমান সংস্কৃতি পরিবর্তনের পথে একটি বড় বাধা হলো পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের অভাব। ডিএসসিসি জোন-২, ওয়ার্ড-৬ এর পরিচ্ছনতা কর্মী উরুকুলা ইসহাক বলেন, "আমরা জানি মেয়রই সবচেয়ে বড় কর্তা। কিন্তু তার কাছে পৌঁছানোর কোনো পথ আমাদের নেই। আমরা বড়জোর কনজারভেন্সি ইন্সপেক্টর পর্যন্ত যেতে পারি। আমাদের দাবি যখন কেউ শোনে না, তখন পরিবর্তনের কোনো রাস্তাই খোলা থাকে না।"

এই দূরত্ব কমানোর জন্য ওয়ার্ড ভিত্তিক অভিযোগ দাখিলের ফোরাম তৈরির সুপারিশ করেন কর্মীরা যাতে যাতে সরাসরি পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ সম্ভব হয়।

কর্মশালায় প্রশিক্ষণ আর দক্ষতা বাড়ানোর গুরুত্বের কথাও উঠে আসে। এই সুযোগ থেকে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বহুদিন ধরেই বঞ্চিত। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) জোন-৩, ওয়ার্ড-৩৫ এর মোহাম্মদ জিলানী তার ইচ্ছা ব্যক্ত করে বলেন, "এরকম কোনো অনুষ্ঠানে আমরা আগে কখনো আসিনি। দক্ষতা বাড়াতে আমাদের আরও বেশি কর্মশালা আর প্রশিক্ষণের দরকার।"

পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের আরেকটি প্রধান দাবি ন্যায্য নিয়োগ। ডিএসসিসি জোন-৪, ওয়ার্ড-৩০ এর ওম দাস বলেন, "আমরা দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া চাই। যাতে যোগ্য প্রার্থীরা ঠিকঠাক সুযোগ পায়।"

চাকরির অনিশ্চয়তা আর অবসরের পর কোনো সুবিধা না পাওয়াটাও একটা বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে। ডিএনসিসি জোন-৩, ওয়ার্ড-৩৬ এর মোহাম্মদ রমিজুদ্দিন ব্যাখ্যা করে বলেন, "আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে কাজ করছি। অথচ এখনও আমরা স্থায়ী কর্মী নই। গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তারা যেমন পেনশন নিয়ে অবসরে যান, আমরা সেরকম কিছুই পাই না। এতগুলো বছর সেবা দেওয়ার পর আমাদের হাতে কোনো জমানো টাকাও থাকে না, আবাসনের জায়গাও থাকে না।"

শহরে পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অপরিহার্য ভূমিকা স্বীকার করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তাদের জন্য ন্যায়বিচার আর সংস্কারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "আজ আপনাদের পাশে দাঁড়াতে পেরে টিআইবি সম্মানিত। আমরা একা হয়তো সব সমস্যার সমাধান করতে পারব না। কিন্তু আপনাদের কাজের পরিবেশে আপনারা যে পরিবর্তন চান, তার জন্য লড়াই করার দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি। আমাদের দেশে হয়তো সম্পদের অভাব আছে। কিন্তু যদি আমরা সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আপনাদের দাবিগুলো পূরণ করা সম্ভব এবং তা করতেই হবে।"

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে টিআইবি ঢাকার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। নীতিনির্ধারক এবং নগর কর্তৃপক্ষের কাছে সংস্থাটি পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অবদানকে স্বীকৃতি প্রদান এবং তাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানায়। টিআইবি মনে করে একটি সমন্বিত, স্বচ্ছ এবং ন্যায়ভিত্তিক সিস্টেম পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অধিকার।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি