প্রকাশকাল: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
দুর্নীতি প্রতিরোধের বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশের ক্রমাবনতি আবারও স্পষ্ট হলো। বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) এর প্রকাশিত দুর্নীতি ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৪ আমাদের দেখালো এক গভীর উদ্বেগজনক চিত্র। গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্কোর মাত্র ২৩ নিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নেমে গেছে ১৫১তম স্থানে। এই পতন জানান দিচ্ছে; আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাসা বেঁধেছে দুর্বলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার চলছে লাগামছাড়া আর স্বচ্ছতা এক সোনার হরিণ!
এই নিম্নমুখী যাত্রা কিন্তু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। টিআই এর গবেষণা বলছে এটা আসলে কর্তৃত্ববাদী আর লুটেরা শাসনের দীর্ঘমেয়াদী ফল। একটা এমন ব্যবস্থা যা সচেতনভাবে দুর্নীতির বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে সমাজের প্রতিটি স্তরে। মুখে দুর্নীতি দমনের কথা বলা হলেও বাস্তবে দেখা গেছে ঠিক উল্টো চিত্র। দেশের আনাচে কানাচে আইনি ফাঁকফোকর ক্ষমতার দাপট আর লুটতরাজের পরিবেশ দুর্নীতিবাজদের স্বর্গরাজ্য তৈরি করেছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন আরও স্পষ্ট। জরুরি ভিত্তিতে দরকার ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। কোনোভাবেই দুর্নীতিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এটা শুধু আমাদের গণতন্ত্রের স্বপ্নকেই ভেঙে দিচ্ছে না বরং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন আর অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির পথেও বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে ভালো। এই তথ্যই যথেষ্ট আমাদের সরকারের ব্যর্থতা বিচারের ঊর্ধ্বে থাকার সংস্কৃতি আর গণতান্ত্রিক নজরদারির দুর্বলতা বোঝানোর জন্য। যেখানে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলো ভারত নেপাল মালদ্বীপ পাকিস্তান শ্রীলঙ্কা তাদের স্কোর ধরে রাখতে পারেনি সেখানে ভুটান আশার আলো দেখাচ্ছে এ বছর তাদের স্কোর বেড়েছে। আরও হতাশাজনক হলো বাংলাদেশের সিপিআই স্কোর এখন সাব সাহারান আফ্রিকার গড় স্কোরের চেয়েও ১০ পয়েন্ট কম! যে অঞ্চল দুর্নীতিতে জর্জরিত বলে পরিচিত তাদের চেয়েও আমরা পিছিয়ে!
যদিও ২০২৪ সালের শেষদিকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হয়েছে, টিআই এর রিপোর্টে এখনও কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। দলাদলি, রাজনৈতিক তোষণ আর প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা এখনও উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) হয়তো কিছু পদক্ষেপ নিতে চেয়েছে কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন তখনই আসবে যখন তারা রাজনৈতিক চাপ আর প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে।
জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার, স্বার্থের সংঘাত আর দলীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। সরকারি কেনাকাটা, ব্যাংকি্ ব্যবসা, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি আর অবকাঠামো কোনো খাতই এর বাইরে নয়। গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ আর সাধারণ মানুষকে দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার ও সমালোচনা করার অধিকার দিতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি হলো আমাদের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত লাভের পথ বন্ধ করতে হবে। সামনে অনেক বাধা তবে এখনও ক্ষীণ আশা আছে। যদি এখনই কঠিন আর স্বচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়া যায় তবে হয়তো জনগণের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব। গণতন্ত্রের স্পৃহা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব; নয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।