প্রকাশকাল: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪
নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত প্রথম ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ডস (আইজেএ) এবং জার্নালিস্টস কনক্লেভ ২০২৪-এ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখানে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক, গবেষণা সংস্থা, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন খাতের অংশীজনরা অংশগ্রহণ করেন।
এ বছর আইজে কনক্লেভের উদ্বোধনী অধিবেশনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনার সূচনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মানের অবনতি, পেশাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ওপর বাহ্যিক চাপ এবং নৈতিক ও কার্যকর সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। আলোচনায় অংশ নেন দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব যারা বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অগ্রসর না হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। আলোচনার সঞ্চালনায় তিনি বলেন, দেশের বাস্তবতার প্রেক্ষিতে যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজন, তা এখনো পূর্ণরূপে বিকশিত হয়নি। আলোচনা ছিল এক গভীর আত্মসমালোচনার উপলক্ষ যেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ মিশনের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা বলেন, "বাংলাদেশে আর্থিক দুর্নীতি বহুগুণে বেড়েছে, অথচ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখনও প্রাথমিক স্তরে রয়েছে।" তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে গণমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জবাবদিহির জরুরি প্রয়োজন ও অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের দুর্বলতার মধ্যকার ব্যবধান।
এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে সাংবাদিক কুররাতুল আইন তাহমিনা বলেন, "নৈতিক সাংবাদিকতার সংস্কৃতি এখনো বাংলাদেশের জন্য একটি দূরের স্বপ্ন।" তিনি বলেন, সাংবাদিকদেরকে যেসব কাঠামোগত চাপে আপোষ করতে হয়, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। তার বক্তব্য ছিল গণমাধ্যমের ভেতরের সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তনের দাবি।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বাবু বলেন, আজকাল অনেক সময় সাংবাদিকতা হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিচ অর্জনের প্রতিযোগিতা। যথাযথ যাচাই-বাছাই বা গেটকিপিংয়ের অভাব সাংবাদিকতার মান হ্রাস করছে। তিনি বলেন, “এই সমস্যা দ্রুত সমাধান না করলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়বে।”
দৈনিক গ্রামের কাগজের সম্পাদক মোবিনুল ইসলাম বলেন, তথ্য অধিকার আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবেন এবং প্রভাবশালীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবেন।
বদরুদ্দোজা বাবু আরও বলেন, প্রযুক্তিগত এবং পেশাগত দিক থেকে সাংবাদিকদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। তিনি বলেন, “অনেক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন মাসের পর মাস পরিশ্রম করেও কখনো প্রকাশিত হয় না।” এ থেকে বোঝা যায় যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা অনেক সময় অপূর্ণতা ও হতাশার মধ্যে পড়েন।
স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ সেন্সরশিপের প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “আত্মনিয়ন্ত্রণ আসে কাঠামোগত সমস্যার কারণে। এর সমাধানে প্রয়োজন সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে প্রশিক্ষণ এবং এমন প্ল্যাটফর্ম যা সাহসী সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেবে।”
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে কীভাবে প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “সরকার চায় সাংবাদিকরা ভয়ের বাইরে থেকে কাজ করুক।” তিনি আরও বলেন, “ভারতের সাংবাদিকেরা জুলাই বিপ্লব নিয়ে যা বলছে, তার প্রেক্ষিতে আমাদের সাংবাদিকেরা এখনো নীরব। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হওয়া উচিত।”
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের পরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, অতীতে কখনো কখনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অপব্যবহারের শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক সাংবাদিক অতীতে অসীম সাহস দেখিয়েছেন। এখন দরকার আত্মসমালোচনা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা।” তিনি আরও বলেন, “ভুল তথ্য মোকাবেলায় আমাদের প্রয়োজন সত্য তথ্য, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং প্রমাণ।”
মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান মুকুর বলেন, “ঝুঁকি থাকবে, কিন্তু আমাদের কঠিন প্রশ্নগুলো করতেই হবে।” তিনি বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিকাশের জন্য এমন রাজনৈতিক পরিবেশ দরকার যা সমালোচনামূলক প্রতিবেদন সহ্য করতে পারে। এর জন্য দরকার হস্তক্ষেপ কমানো, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কাঠামো তৈরি এবং সাংবাদিকতাকে জনসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখা।
আলোচনায় বক্তারা একমত হন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ সহজ নয় বরং এটি একটি অবিরাম যাত্রা। তারা বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনার একটি হাতিয়ার এবং নাগরিকদের সমাজের জটিল বাস্তবতা বোঝার মৌলিক অধিকার।
উপস্থিত মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিকাশের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত, সম্মিলিত এবং বহুমাত্রিক প্রচেষ্টা। এর মধ্যে রয়েছে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুসন্ধানী টুলস অন্তর্ভুক্ত করা, আইনি কাঠামো সংস্কার, সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কার। টিআইবি মনে করে সরকার, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সাহসী সাংবাদিকতা মূল্য পাবে।