বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে তরুণরাই

প্রকাশকাল: ২২ অক্টোবর ২০২৪

“সৌরশক্তি চালিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির নির্ভরযোগ্যতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে হলে সৌর প্যানেলের কর্মক্ষমতা উন্নত করা অপরিহার্য।” এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ‘সাসটেইনেবিলিটি স্পার্কস’ দলের সালমান হোসেন ও আল মুমতাহিনা আরিকা মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে সোলার প্যানেল ক্লিনিং সিস্টেম এ ডাস্ট কালেকশন প্রসেস আরও কার্যকর করার উপায় উদ্ভাবন করেন। এই উদ্ভাবনী প্রকল্পটিই তাদের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত দেশের সর্বপ্রথম ‘ইয়ুথ আইডিয়া কনটেস্ট অন রিনিউয়েবল এনার্জি ২০২৪’-এ বিজয়ীর পুরষ্কার এনে দেয়।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিম গ্রিন কুলার’-এর সদস্য সাওদা মুনতাহা ও ইশরাক তাইয়্যিম রেজা সৌরশক্তি চালিত গ্রামীণ হিমাগার ব্যবস্থার আরেকটি উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করে প্রথম রানার-আপ হন। এই ব্যবস্থাটি একটি সোলার হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকল (এসএইচইভি) এর সঙ্গে যুক্ত, যা তাজা খাবার সংরক্ষণ করে এবং সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ ও মজুত করে। এর মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎবিহীন এলাকায় খাদ্য নিরাপত্তা উন্নত করার লক্ষ্য পূরণ হয়।

তরুণদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমাধান খুঁজে বের করতে উৎসাহিত করার জন্য টিআইবি এই আইডিয়া কনটেস্ট ২০২৪ আয়োজন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল নীতিগত স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা। এই অভিনব প্রতিযোগিতায় ৮৯টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দলের কাছ থেকে মোট ৮৪টি ধারণাপত্র জমা পড়েছিল। চূড়ান্ত পর্বে মনোনীত ৩০টি দল ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর সাভারের আশুলিয়ায় সিসিডিবি হোপ সেন্টারে তিন দিনের আবাসিক কর্মসূচিতে অংশ নেয়। এই অসাধারণ উদ্যোগগুলো শুধু প্রযুক্তির উন্নতি নয়, বরং বিশ্বকে উন্নত করার জন্য শিক্ষার্থীদের অঙ্গীকারকেও প্রতিফলিত করে। তারা যুগান্তকারী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমাধান প্রদর্শন করে প্রমাণ করেছে যে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ প্রকৃতপক্ষেই অর্জন সম্ভব।

প্রতিযোগিতার প্রত্যাশিত ফলাফলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, ‘টিম এনার্জি-ফেরি’ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের জন্য ডুয়াল এনার্জি হারভেস্টিং সলিউশন উপস্থাপন করে দ্বিতীয় রানার আপের পুরষ্কার জিতে নেয়। দ্বিতীয় রানার-আপ দলের নেতৃত্বে থাকা সাঈদ হোসেন সায়র বলেন, “আমরা চাই বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চার্জিং ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসুক। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পরিবেশবান্ধব পরিবহন খাতের জন্য টেকসই অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” নদীর ধারে সৌর পার্ক তৈরি করে ভ্রাম্যমাণ ব্যাটারি স্টেশনগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমানোই ছিল তাদের উদ্ভাবনী ধারণা।

প্রতিযোগিতায় জমা পড়া এমন ব্যতিক্রমী ধারণাগুলোকে স্বীকৃতি জানিয়ে টিআইবির এনার্জি গভর্ন্যান্স কোঅর্ডিনেটর জনাব নেওয়াজুল মাওলা প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উদ্ভাবনী সমাধান এবং সকল পক্ষের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উদ্বোধনের পর দুটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশন, “বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সুশাসন: সমাধানের পথ” পরিচালনা করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো জনাব মাহফুজুল হক। দ্বিতীয় অধিবেশন, “বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত: নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা” উপস্থাপন করেন কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন) এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মেহেদী। এই অধিবেশনগুলোতে স্রেডা এর জনাব আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং দৈনিক প্রথম আলোর জনাব গোলাম ইফতেখার মাহমুদের মতো শিল্প বিশেষজ্ঞরা প্রতিযোগিতায় প্রদর্শিত প্রোটোটাইপ উপস্থাপনাগুলোর ওপর মতামত দেন।

অংশগ্রহণকারীদের ধারণা পরিমার্জন এবং বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি শিল্পে প্রকল্প পরিকল্পনার বিষয়ে তাদের বোঝাপড়া উন্নত করার জন্য ১৮ অক্টোবর বিশেষজ্ঞরা কর্মশালা পরিচালনা করেন। টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ডিরেক্টর মুহাম্মদ বদিউজ্জামান ব্যয়-সাশ্রয়ীতা এবং অর্থনৈতিক সুবিধার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা, ব্যবসায়িক মডেল, পরিবেশগত দিক এবং সুশাসনের ওপর। অন্যদিকে, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিরেক্টর মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম শক্তিশালী ব্যবসায়িক মডেলের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সন্ধ্যাটি একটি জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হয়, যা অংশগ্রহণকারী, তাদের মেন্টর এবং শিল্প নেতৃত্বদের মধ্যে নেটওয়ার্কিং এ সহায়তা করে।

১৯ অক্টোবর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এ. কে. এনামুল হক; বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার মেহরীন আহমেদ মাহবুব; স্রেডার এনার্জি এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড কনজারভেশন সদস্য রতন কুমার ঘোষ; খ্যাতনামা গবেষক হাসান মেহেদী; এবং বেসরকারি খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী দিপাল চন্দ্র বড়ুয়া প্রতিযোগিতার বিচারকার্য সম্পন্ন করেন। উদ্ভাবনী নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমাধানগুলোর মধ্যে ছিল বর্জ্য থেকে শক্তি রূপান্তর, ২০৫০ সালের একটি রূপরেখাসহ নীতি সংস্কারের প্রস্তাব, সতেজতা রক্ষার জন্য একটি বহনযোগ্য সৌরশক্তি চালিত হিমাগার ও পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি, পৌরসভার জৈব বর্জ্যকে বায়োফুয়েলে রূপান্তর, এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বায়ু ও তরঙ্গ শক্তিকে একত্রিত করার লক্ষ্যে দ্বৈত শক্তি আহরণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জীবাশ্ম জ্বালানির সমস্যা নিয়ে বক্তব্য দেন এবং নিজ নিজ মতামত তুলে ধরেন। এই পর্ব থেকে তিনজন বিজয়ী নির্বাচিত হন। এরপর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বক্তব্য রাখেন এবং তাঁর নেতৃত্বে সকলে দুর্নীতিবিরোধী শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর আন্তরিক ভাষণে ড. জামান জোর দিয়ে বলেন যে, প্রতিযোগিতায় দাখিল্কৃত উদ্ভাবনী ধারণাগুলোর জন্য সকল প্রতিযোগীই বিজয়ী। তিনি সামাজিক পরিবর্তনে, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে তরুণদের নেতৃত্বের গুরুত্ব সম্পর্কেও আলোচনা করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে টিআইবি সর্বদা তাদের পাশে থাকবে, কারণ তিনি বিশ্বাস করেন যে ভবিষ্যতে তারা জনকল্যাণে যুগান্তকারী প্রকল্প পরিচালনায় নেতৃত্ব দিতে পারবে।

ইয়ুথ আইডিয়া কনটেস্ট তরুণ চেঞ্জমেকারদের মধ্যে সহযোগিতা ও সৃজনশীলতার চেতনা জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি এই ধারণাকেও শক্তিশালী করেছে যে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ অর্জনযোগ্য। চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তরিত করে এই দূরদর্শী তরুণরা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে একটি উজ্জ্বল, নবায়নযোগ্য ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করছে।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি