স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ডেটা সাংবাদিকতা: নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের ক্ষমতায়নে কর্মশালা

প্রকাশকাল: ১২ মে ২০২৪

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে হঠাৎ প্রশ্ন, “আচ্ছা, পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির কথা কেউ শুনেছ?” ব্যস, অমনি নড়েচড়ে বসল শিক্ষার্থীরা। এক অজানা জগতের দরজা খুলে গেল তাদের সামনে। তুমুল উৎসাহে তারা বলতে শুরু করে সেই বিখ্যাত কেলেঙ্কারির গল্প। যেখানে ফাঁস হয়েছিল ১ কোটি ১৫ লাখ গোপন দলিল। আর তাতেই বেরিয়ে এসেছিল ২০০টি দেশের নামিদামি ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা আর বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজারের বেশি এমন ঘটনা আলোতে এসেছিল। এই ঘটনাকেই এখন ডেটা সাংবাদিকতার এক চমৎকার উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।

ঠিক এই প্রসঙ্গটিই টেনে এনেছিলেন টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বোঝাতে চাইলেন, কীভাবে তথ্যের গভীরে ডুব দিয়ে একজন সাংবাদিক দুর্নীতির আসল চেহারাটা বের করে আনতে পারেন, নিশ্চিত করতে পারেন স্বচ্ছতা আর জবাবদিহি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সঙ্গে মিলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত কর্মশালায় এই কথা বলেন তিনি। ১২ মে ২০২৪ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই বসেছিল এই আসর। ৪৫ জন শিক্ষার্থী দারুণ আগ্রহ নিয়ে এতে অংশ নেয়। মূল উদ্দেশ্য ছিল, সাংবাদিক হতে চাওয়া এই তরুণদের ডেটা সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। আর তাদের হাতে এমন কিছু কৌশল তুলে দেওয়া, যা দিয়ে তারা অনিয়ম বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়তে পারবে, ধরে রাখতে পারবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঝান্ডা।

সবুজে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের অন্যতম প্রাচীন ক্যাম্পাসে সকাল ১১টায় শুরু হয় দিনব্যাপী এই আয়োজন। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন রওশন আক্তারের (সহযোগী অধ্যাপক) হাতে তুলে দেন ডেটা সাংবাদিকতা বিষয়ক একগুচ্ছ বই। এই বইগুলো শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনার কাজে ব্যবহার করতে পারবে।উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের তার বক্তব্যে সাংবাদিকতায় ডেটার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যেকোনো খবর প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করা খুব জরুরি, না হলে খবরের মানেই পাল্টে যেতে পারে। তথ্য হলো স্বচ্ছতার একটা বড় হাতিয়ার। তাই শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে তথ্য ব্যবহারে পারদর্শী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ঘটনা এবং কীভাবে ডেটা সাংবাদিকতা এই ধরনের ঘটনা সামনে নিয়ে আসে, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি শিক্ষার্থীদের দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, তাদের নিষ্ঠা আর দৃঢ়তা সমাজে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে।

চবি যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারপার্সন রওশন আক্তার বলেন, ডেটা সাংবাদিকতা খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করে। তিনি শিক্ষার্থীদের এই কর্মশালা থেকে মূল্যবান জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহিত করেন।

একই বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী আজগর চৌধুরী এমন একটি সময়োপযোগী উদ্যোগের জন্য টিআইবিকে ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

কর্মশালায় সেশন নিতে থাইল্যান্ড থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়েছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী। তার পরিচালিত অধিবেশনে শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার গড়ার ব্যাপারে তাদের গভীর আগ্রহের কথা জানায় এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নিজেদের ভাবনাগুলো তুলে ধরে। প্রত্যেকেই তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন লেখার আগ্রহ দেখায়। এই অধিবেশনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল যখন প্রশিক্ষক প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে তথ্যের বাস্তব ব্যবহার হাতে-কলমে দেখান।

এরই অংশ হিসেবে, প্রশিক্ষক মিরাজ আহমেদ তাদের ‘গঙ্গা নদীর ক্ষুধার্ত শিশুরা’ শিরোনামের একটি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিবেদন দেখান। এই প্রতিবেদনে স্যাটেলাইট ছবি এবং অন্যান্য সহজলভ্য তথ্য ব্যবহার করে ভারতের বিভিন্ন বাঁধের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নদী সমস্যা নিয়ে বহুদিনের যে বিতর্ক, তার প্রেক্ষিতে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বাঁধ সম্পর্কে অজানা সব তথ্য উন্মোচন করেছিল।

টিআইবির সহকারী সমন্বয়কারী কে.এম. রফিকুল আলম শিক্ষার্থীদের তথ্য ব্যবহারের কারিগরি দিকগুলো শিখিয়েছেন। তিনি স্প্রেডশিটের প্রাথমিক ব্যবহার দেখানোর পাশাপাশি তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন কোডিং ভাষারও ধারণা দেন।

বিকেল ৫টায় সনদপত্র বিতরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয়। অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের কাছ থেকে সনদপত্র গ্রহণ করেন।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি