pic_ms_iacd7_16_en.jpg

বিজ্ঞাপনে নৈতিকতা, নৈতিকতায় বিজ্ঞাপন

User Rating:  / 33
PoorBest 

বিজ্ঞাপনের আভিধানিক অর্থ বিশেষভাবে জ্ঞাপন বা জানানো। এটি একটি উপায় যার মাধ্যমে নতুন কিছুর আগমনি বার্তা জানানো হয়। শুধু তাই নয়, পুরোনো বা চালু পণ্য/সেবার নতুন গ্রাহক তৈরির কৌশল বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের অনেক মাধ্যম থাকলেও টেলিভিশনে প্রচারিত বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব অন্য মাধ্যমের তুলনায় অনেক বেশি। টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের শুরুতে বিজ্ঞাপন, মধ্যে বিজ্ঞাপন, শেষে বিজ্ঞাপন। কখনও কখনও বলতে শোনা যায়, ‘এখন বিজ্ঞাপন বিরতি (বিরক্তি!), এরপর ফিরে আসছি অনুষ্ঠানের পরের অংশে। ততক্ষণ অন্য কোথাও যাবেন না।’ যেয়েও লাভ হয় না, ওখানেও একই ‘বিরক্তি’। আর নৈতিক বিষয়কে প্রতিনিধিত্ব করেনা- এমন বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে হাজারো। অনৈতিক ও ভুল বার্তা প্রদানকারী টেলিভিশন বিজ্ঞাপন প্রচার ও এর প্রভাব নিয়ে আজকের এই লেখা।

শিশুদের, তরুণদের বিজ্ঞাপন কিভাবে প্রভাবিত করছে তার বর্ণনায় যাওয়ার আগে কয়েকটি বিজ্ঞাপনের ভাষা, রূপ, দৃশ্য ইত্যাদির বর্ণনা করছি।
বিজ্ঞাপনটি কাপড় ধোয়ার গুড়া সাবানের। স্কুল বালকেরা খেলার সময় ক্রিকেট বল দিয়ে একটি বাড়ির জানালার কাচ ভেঙ্গে ফেলে। বল কুড়াতে কে যাবে এ নিয়ে জটলা। একজন সাহস দেখিয়ে ভিতরে যায়। ‘ক্রিকেট খেলবে, ছক্কা হাকাবে, কাচ ভাঙ্গবে’, বলতে বলতে বালকটির এক হাতে শাস্তি দিতে উদ্যত হন বাড়ির মালিক। বালকটি তখন দুই হাতই বাড়িয়ে দেয়। বলে,‘আংকেল, দুই হাতেই মারেন। কারণ, পরের বলটাও ছক্কা হবে।’ এ সময় বালকটির চেহারায় যে ধৃষ্টতা ফুটে উঠে তা যেকোন গোঁয়ার বালকের থেকে কম নয়। এই যে একের বদলে দুই হাত বাড়িয়ে দেওয়া, এটাকে ভাষ্যকার বলে দিচ্ছেন, ‘লক্ষ্য যদি হয় দ্বিগুণ উজ্জ্বল, তবে কাপড় কেন নয়?’ ব্যাস, শাস্তির বদলে তার উপহার মিলল বল, আদর আর সার্টের কলার ঠিক করে দেওয়া। ভাগ্যিস! বালকের সার্টটি ঐ গুড়া সাবান দিয়ে ধোয়া ছিল।
এটি একটি শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন। হোস্টেল সুপার মেয়েদের রুমে এসে সাবধান করে দিচ্ছেন, ‘রাত দশটার পর বাইরে যাওয়া নিষেধ।’ মেয়েরা ‘বাইরে’ যাবে না বলে দোহাই দেয়, ‘ম্যাম, কিভাবে? এই ভিজা চুল নিয়ে?’ অথচ, এই ভিজা চুল নিয়েই লুকিয়ে তারা বাইরে যায়, পার্টিতে অংশ নেয়। নেচে গেয়ে বেড়ায়। শ্যাম্পুটির এমন গুণ- চুলকে লক (তালাবদ্ধ) করে, মিথ্যাকে নয়, প্রবঞ্চনাকে ত নয়ই।
ক্যান্ডির বিজ্ঞাপন এটি। বাসর রাতে নববধূর হাতে অমুক+তমুক উল্কি দেখে বেচারা স্বামীর মন বেদনা, ‘তুমি এখনো ‘তমুক’কে ভুলতে পারনি?’ ‘অ্যাটম খাও, চাপার জোর বাড়াও’- চাপার জোরে ‘তমুক’ হয়ে যায় আজকের এই স্বামী।
কোমল পানীয়ের বিজ্ঞাপন। সম্ভবত রোজাকে উপলক্ষ করে তৈরি। মা-বাবা-বোন ইফতারি সাজিয়ে বসে আছে। হালিম (অন্য কিছুও হতে পারে) আনতে ছেলের দেরি হচ্ছে। এদিকে ইফতারির সময়ও ঘনিয়ে আসছে। একসময় এক হাতে হালিম আর অন্য হাতে সেভেন আপের বোতলসহ তার চাচা ও চাচাত ভাইকে নিয়ে ছেলেটি ঘরে ফিরে। তখন যা কর্তব্য তাই করলেন ছেলের মা-বাবা। দ্রুত চেয়ার দেখিয়ে বসতে দিলেন। সবই ভালো। কিন্তু, ইফতারির পূর্ব মুহুর্তে অনাহূত অতিথি আসায় বাবা-মায়ের বিরক্তমাখা পরস্পর দৃষ্টি বিনিময়- ইফতারির মত অনুষ্ঠান বা ঐ কোমল পানীয়টির সাথে কী অর্থ প্রকাশ করে বুঝা গেল না।
ইন্টারনেট মডেমের বিজ্ঞাপন। বিদেশি প্রতিষ্ঠানে ভিডিও চ্যাটের মাধ্যমে চাকরির ইন্টারভিউ হবে। ছেলেটির এত সময় নাই। বন্ধুবান্ধবসহ কমলাপুর রেল স্টেশনে সময় কাটাচ্ছে, সম্ভবত ট্রেনে চড়ে কোথাও যাবে। এমন সময় কল আসলে ছেলেটি সবাইকে নিয়ে দ্রুত পরিবেশ বদলের চেষ্টা করে। কোন একজনের কাছ থেকে কোট টাই ধার করে থ্রি কোয়ার্টার পেন্টের সাথে পড়ে নেয়, পর্দা দিয়ে আড়াল করে স্টেশনের হট্টগোল, লোকজনের আনাগোনা ইত্যাদি। এক সময় সফলতার সাথে ইন্টারভিউ শেষ হয়। তখন ভাষ্যকার বলে উঠেন, ‘দ্রুত গতির ইন্টারনেটে এখন এমন কিছু হবে, যা কেউ ভাবেনি আগে।’ পাঠক, সত্যিই এখন এমন অনেক কিছু হচ্ছে, হবে। মোবাইল, দ্রুতগতির ইন্টারনেটের আর কোন পজিটিভ ব্যবহার নেই বোধ হয়। তালিকা আর বাড়াবো না। স্রোতের বিপরীত বিষয়কে বিজ্ঞাপনে প্রাধান্য দেওয়ায়, তা অনবরত প্রচারিত হওয়ায় এবং বারবার দেখতে থাকায়, সেই বিপরীত বিষয়ই স্বাভাবিক মনে হতে থাকবে। যেমন, একটি মিথ্যা বারবার বললে, সেটি সত্য রূপে মনে হয়, তেমন। এ ধরণের বিজ্ঞাপন থেকে কী শিখছে আমাদের শিশু ও যুব সমাজ? বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ শাসন করলে আরো বেশি উদ্ধত হওয়া; নিয়ম না থাকলেও মিথ্যা বলে, লুকিয়ে নিয়ম ভাঙ্গা; সত্য ভুলে চাপার জোর বাড়ানো; যেকোন অতিথি এলে বিরক্তভাবকে অদৃশ্য রেখে অলীক আতিথেয়তা দেখানো; কেউ দেখতে পেলনা বলে শঠতার আশ্রয় নেওয়া- এগুলোই কি বিজ্ঞাপনের প্রধান উপজীব্য? এ সবই কি শিখবে আমাদের শিশু ও তরুণরা? যা কোনভাবেই কোন অভিভাবক কামনা করেন না। তাহলে বিজ্ঞাপন কি পন্য বা সেবার গুণাগুণ প্রকাশ করা ছাড়াও যুব সমাজের চারিত্রিক বৈকল্যকে বাড়িয়ে দিচ্ছে না?
আমাদের দেশে দেশিয় বিজ্ঞাপন ছাড়াও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। তারা বেশিরভাগ বিজ্ঞাপন একটি দেশের জন্য তৈরি করে আর সেগুলো নানান দেশে নানান ভাষায় ডাবিং করে প্রচার করে (শস্তা বুদ্ধি!)। এতে অন্যদেশের উপযুক্ত বিজ্ঞাপন আমাদের দেশে প্রচারিত হলে আর তা উপযুক্ত থাকে না। এদেশের সংস্কৃতি, পোশাক-আশাক, মানুষের চেহারার বৈসাদৃশ্যের কারণে বিজ্ঞাপনটিকে ভাঁড়ামো মনে হয়। বিজ্ঞাপনটি দেখলে চোখে বাজে, শুনলে কানে বাজে। বহুজাতিক এমনো বিজ্ঞাপন আছে যা উন্নত দেশে নিষিদ্ধ, কিন্তু আমাদের দেশে এখনও প্রচারিত, এমনকি সর্বাধিক প্রচারিত। ‘হরলিক্সের’ বিজ্ঞাপনে ভাষ্যকার বলেন এই পানীয় খেলে বাচ্চারা আরো লম্বা, আরো শক্তিশালী, আরো বুদ্ধিদীপ্ত হবে। পণ্যটির উৎপাদনকারীর এই দাবীর কোন ভিত্তি না থাকায় উন্নত দেশে বিজ্ঞাপনটি নিষিদ্ধ হয়েছিল। বরং তারা এটা স্বীকার করে নিয়েছিল যে, বিজ্ঞাপনটি বাংলাদেশের মত অনুন্নত দেশের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, ভুলে তা উন্নত দেশে (ব্রিটেনে) প্রচারিত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত নেস্লের ম্যাগি নুডুলস এর বিজ্ঞাপনও ব্রিটেনে একই কারণে নিষিদ্ধ হয়েছিল। বিজ্ঞাপনের ভাষ্য ছিল- এই নুডুলস খেলে হাড় ও মাংশের গড়ন বৃদ্ধি পায়! বহুজাতিক তামাশা আর কি।
(এজন্য দেখুন, http://news.bbc.co.uk/2/hi/uk_news/7683259.stm ও অন্য আরেকটি লিংক- http://www.utalkmarketing.com/pages/article.aspx?articleid=12111&title=%22accidental%22-horlicks-and-nestl%C3%A9-ads-banned-by-asa)

বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পণ্যের গুণাগুণ প্রচার হবে এটাই সত্য। এই সত্য প্রচারে অনেকেই মিথ্যার আশ্রয় নেন। কোমল পানীয়, জুস এগুলোর বোতলে, মোড়কে তাজা ফলের ছবিটি থাকে সত্য। কিন্তু কেউ যদি বোতলটির, মোড়কটির লেভেল ভালো করে পড়ে দেখেন তাহলে কেউই আসল আমের রস, তাজা কমলার রস খুঁজে পাবেন না। পাবেন আম বা কমলার কৃত্রিম ফ্লেভার। ‘হাতের স্পর্শ নেই বলে কোন প্রিজারভেটিভ দেওয়া হয় না’- এ কথা যারা বলেন তারাও মিথ্যা বলেন। হাতের স্পর্শ না থাকলেও প্রিজারভেটিভ দিয়ে থাকেন অনেকে। বিজ্ঞাপনে আশ্বস্ত হয়ে ক্রেতারা নিজের জন্য, বাচ্চার জন্য, অতিথির জন্য আসল ফলের রসের পানীয় কিনছেন আর তা না পেয়ে শেষমেষ প্রতারিত হচ্ছেন। মিথ্যা আরো বলা হয়। আমরা জানি দুধ অতি সুষম একটি খাবার। এটি শক্তিশালীও বটে। দুধের শক্তি বাড়ানোর কথা জানা না থাকলেও এর শক্তি কমানোর কথা জানি। ননি তুলে দুধের শক্তি কমানো হয়। দুধের সম্পূর্ণ ননি তুলে নিলে সেই দুধকে বলি- ‘ফুলক্রিম দুধ’। যেখানে দুধের শক্তি কমানো হয়, সেখানে দুধের শক্তি বাড়াতে বলা হয়, ‘এটা (একটি মল্টেড ড্রিংক) মিশান, দুধের শক্তি বাড়ান’। ব্যাস, এখন থেকে দুধের গ্লাস প্রতিদিন হবে খাল্লাস। মিথ্যার শেষ নাই। এনার্জি ড্রিংক থেকে শুরু করে হাতে লাগানো মেহেদি সবখানেই মিথ্যার ফুলঝুড়ি। প্রাকৃতিক মেহেদি হাতে লাগাতে গাছ থেকে পাতা ছিড়–ন নতুবা বাজার থেকে পাতা কিনুন, বেটে তা ব্যবহার করুন। ১০০% প্রাকৃতিক বলা হলেও টিউবে যত মেহেদি পাওয়া যায়, কোনটিই ১০০% প্রাকৃতিক না। ঔষধ প্রশাসনের নীতিমালাকে তোয়াক্কা না করে টিভি চ্যানেলে প্রচার হয়- হোমিওপ্যাথি, হারবালসহ নানা চিকিৎসা পদ্ধতির বিজ্ঞাপন। সেখানেও থাকে সাজানো নাটক।
বিজ্ঞাপনে যৌনতার প্রসঙ্গটি পড়ে আপনাদের মনে খটকা লাগতে পারে। আমাদের দেশিয় চ্যানেলগুলোতে এখন পর্যন্ত এর দৃষ্টান্ত নাই। স্যাটেলাইটের বদৌলতে আমরা বিদেশি চ্যানেল ত দেখি। বডি ¯েপ্র, ডেউডারেন্ট, কনডম ইত্যাদির বিজ্ঞাপন যৌনতাকে আশ্রয় করে তৈরি হয় না- একথা কেউ বলতে পারবে না। পুরুষ ¯েপ্র করলেই পরীসদৃশ নারীরা বাড়ি ঘর ভেঙ্গে মর্তে পড়ে; পুরুষের বডি ¯েপ্রর বিজ্ঞাপনে নারী ভাষ্যকার প্রশ্ন করেন, ‘আজ রাতে কোথায় যাবেন?’; স্বল্প বসনা ..... না থাক, আর বলতে চাই না, যা বুঝার বুঝে গেছেন এতক্ষণে। ব্যবসায়ীরা, নির্মাতারা নারীকে পণ্যই বানিয়ে ফেলছেন। অনেক আগে বাংলাদেশে নাসির গোল্ড বা এ নামে কোন একটি সিগারেটের বিজ্ঞাপন হতো। সেখানেও নারীকে অসম্মানজনকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে যেকোন সিগারেটের বিজ্ঞাপন অবশ্য নিষিদ্ধ।
আমাদের দেশি একটি বিজ্ঞাপন। প্রথমে ভেবেছিলাম ভারতীয়। লিজান মেহেদির বিজ্ঞাপন। শাহরুখ আর ক্যাটরিনাকে দিয়ে করানো। ট্যাগ লাইনে ইংরেজি অক্ষরে হিন্দিউচ্চারণে আবতক না যবতক.... কি যেন লেখা। অভস্ত বাংলায় নয় ত, তাই পুরোটা পড়তে পাড়লাম না। শাহরুখ আর ক্যাটরিনাকে দিয়ে চিত্রিত করেছেন, ভালো কথা, ট্যাগ লাইন এত বিচিত্র কেন? যা বলতে চান তা কি বাংলায় বলা যেত না? পাক্কা মুসলমান হতে, আশেকে রাসুলের মন নিয়ে ইবাদত করে খোদার দিদার লাভ করতে চাইলে কোন্ পিরের কাছে যেতে হবে তারও বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে টিভিতে! আহারে বিজ্ঞাপন! অন্য পিরেরা যদি এমন বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু করেন তাহলে কি যে হবে, তা খুবই অনুমেয়।
রচনাটি বিজ্ঞাপন বিরূপভাবাপন্ন নয়। ভালো বিজ্ঞাপন হচ্ছে না যে তা নয়, তবে সংখ্যায় খুবই কম। দুই একটি সুন্দর, রুচিশীল ও স্পর্শী বিজ্ঞাপনের কথা বলছি। এতে করে বিজ্ঞাপনের ‘বিজ্ঞাপন’ হয়ে গেলে হোক। নান্দনিকতার নিন্দনীয় কোন রূপ নাই আর সুন্দর সর্বদা নমস্য। টেলিটক থ্রি জি’র বিজ্ঞাপন। বড় ভাই বিদেশে থাকে। ছোট বোন বাকশক্তিহীন। পরিবারের সকলের সাথে ইশারায় কথা বলে মেয়েটি। ভাইয়ের ফোন এলে মা খালারা তাকে ডাকলে, তাদেরকে ইশারায় সে জানিয়ে দেয়, ‘বলে দাও, আমি ভালো আছি।’ তারা শেষপর্যন্ত ফোনটি নিয়ে মেয়েটির কাছে আসে। ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রথমবারের মত ইশারায়-ইশারায় কথা হয় ভাই-বোনের। ভাইয়ের ফোন এলে তার সাথে কথা বলতে না পারা, তাকে দেখতে না পাওয়ার দুঃখ নিমিষেই দূর হয়ে যায়। ভাই-বোনের শাশ্বত মধুর সম্পর্ককে প্রতিভাত করে এই বিজ্ঞাপন।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আবেদনময়ী বিজ্ঞাপন এটি। এই ঈদে অসংখ্য সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে নতুন জামা উপহার দিবে রবি মোবাইল অপারেটর। এই উদ্যোগে রবি গ্রাহকদের সহযোগিতা কামনায় বিজ্ঞাপনটি যে গল্প উপস্থাপন করেছে তা এক কথায় চমৎকার। বিজ্ঞাপনটির সবচেয়ে স্পর্শী দৃশ্য হচ্ছে, ছোটভাইটি তার গায়ের জামাটি খুলে উল্টিয়ে আবার পড়ে নেয়। বড় ভাইকে দেখিয়ে বলে, ‘ভাই, দেহ, আমার নতুন জামা, নতুন অইছে না?’ তখন অনেক কষ্টে টাকা জমিয়েও ছোটভাইয়ের জন্য পছন্দের জামা কিনতে না পারায় বড় ভাইটির দুঃখ মুহুর্তেই মিলিয়ে যায়। এই বিজ্ঞাপনে ‘রবি শিশুশ্রমকে উৎসাহিত করে না’ ট্যাগ লাইনটির ব্যবহার তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতারও পরিচয় দেয়।   
বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের খুবই চোখ ও মন জুড়ানো বিজ্ঞাপন। প্রচার হতে দেখা গেছে ২০১১’র ক্রিকেট বিশ্বকাপের সময়ে। একজন বিদেশিনী বাংলাদেশকে দেখছে আর নতুনভাবে আবিস্কার করছে। বিজ্ঞাপনটিতে শুধু যে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও পর্যটন এলাকা দেখানো হয়েছে তা না, দেখানো হয়েছে বাংলার মানুষের জীবন ও জীবনসংগ্রাম। স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে ‘জীবনের সমারোহ’ বা ‘

‘School of Life’ বলে। এর বহুল প্রচার আশা করছি। এতে অনেক দেশি ও বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশকে নতুনভাবে আবিস্কার করতে পারবে।
প্রিমিয়ার ব্যাংকের বিজ্ঞাপন। এক তরুণ অনেক প্রতিকূলতা পেরিয়ে সুউচ্চ পর্বতে আরোহন করতে চাচ্ছে। অনেকে তাকে নিরুৎসাহিত করছে বিপদসংকুল এই অভিযাত্রাকে। একজন সাহস ও সরঞ্জাম দিয়ে তরুণটিকে উৎসাহ দিলে সে তার কাজে সফল হয়। শত বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও কার্যকর সহযোগিতা ও সমর্থন পেলে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব- এমন বার্তা প্রদান করায় বিজ্ঞাপনটি নজরে আসে।
বিজ্ঞাপন যেন সৃষ্টি থেকেই চলছে। অমোঘ সত্য যে, বিজ্ঞাপন কখনো বন্ধ হবে না। দেখতে হবে, বিজ্ঞাপনটি সত্য ও রুচিশীল কিনা? বিজ্ঞাপনে ভুল বার্তার কারণে শুধুমাত্র ভোক্তারাই ক্ষতিগস্ত হন না, অনৈতিক বিজ্ঞাপনের প্রভাবে গোটা সমাজও বিকারগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশে একটি সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪ রয়েছে যেটা এখন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত। এই নীতিমালার চতুর্থ অধ্যায়টি বিজ্ঞাপন সম্প্রচার সংক্রান্ত। (দেখুন, http://www.moi.gov.bd/National_Broadcasting_Policy.pdf) আশা করবো নীতিমালাটি সব চ্যানেলের জন্য প্রযোজ্য হবে। এটি কার্যকর হলে অনৈতিক ও রুচিহীন বিজ্ঞাপন সম্প্রচার কিছুটা বন্ধ হবে। তবে যাইহোক, বিজ্ঞাপন তৈরিতে ও প্রচারে সচেতন হতে হবে সংশ্লিষ্ট সকলকে।
এ জন্য কিছু সুপারিশ তুলে ধরছি। ক. রাষ্ট্রীয়ভাবে সকল টিভি চ্যানেলের জন্য একটি পরিপূর্ণ বিজ্ঞাপন নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। খ. বিজ্ঞাপন মনিটরিং সেল বা Advertisement Standard Authority (ASA) গঠন করা। এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য ছারপত্র প্রদান করবে, রুচীহীন ও ভুল বার্তা বহন করে এমন বিজ্ঞাপন প্রচারের অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখবে, প্রয়োজনে প্রচার নিষিদ্ধ করবে। গ. বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন আমাদের দেশেই তৈরি করে, আমাদের মত উপযোগী করে প্রচার করতে হবে। ঘ. বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসনকে খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (Food and Drug Administration- FDA) রূপে পরিবর্তন করতে হবে। তারা নিয়মিত অন্যান্য কার্যক্রমের সাথে খাদ্য (শিশু খাদ্যসহ সকল ধরণের খাদ্য সামগ্রী, পানীয় ইত্যাদি), ঔষধ ও চিকিৎসা বিষয়ক বিজ্ঞাপন নীতিমালা তৈরি করবে। সুপারিশের প্রথমে যে পরিপূর্ণ নীতিমালার কথা বলা হয়েছে সেখানে এই প্রশাসনের প্রণীত নীতিমালা সমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এই সুপারিশ উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য। আপনার ব্যবসা প্রসারের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরি করবেন, ভালো কথা, অহেতুক অঢেল টাকা পয়সা খরচ করে অনৈতিক বার্তা প্রকাশ পায় এমন বিজ্ঞাপন তৈরির মাধ্যমে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করবেন না। রুচিশীল ও প্রকৃত সত্য উপস্থাপন করুন আপনার বিজ্ঞাপনে। এটি আপনার সামাজিক দায়বদ্ধতা। বিজ্ঞাপন যারা তৈরি করেন তারা অত্যন্ত মেধাবী। অরুচীকর বিজ্ঞাপন তৈরি করে সে মেধাকে নষ্ট করে দিবেন না। আপনাদের শাণিত মেধা দিয়ে তৈরি করুন অর্থবহ ও নৈতিক বার্তাবহ বিজ্ঞাপন। সত্য ও নৈতিকতা বিজ্ঞাপিত হোক সকল বিজ্ঞাপনে।


কৃতজ্ঞতা:
১.    আ ব ম ফারুক, অধ্যাপক, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(রচনা- ফলের রস আর কোলা পানীয়ের প্রতারণা ঠেকাতে অবিলম্বে বিজ্ঞাপন নীতিমালা চাই, প্রকাশ- http://nbiis.org, তারিখ ১৯ জুলাই ২০১৩)
২.    ইকতেদার আহমেদ, সাবেক জজ, সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(রচনা- অনৈতিক বিজ্ঞাপন, প্রকাশ-http://www.dailynayadiganta.com, তারিখ ১২ মে ২০১৪)

Comments   

 
0 #2 RAFIUL ISLAM 2015-11-01 10:15
আপনার লেখা গুলো হচ্ছে সমালোচনার অংশ।
খেয়ে দেয়ে কাজ না থাকলে মানুষ আরো কত কি করতে পারে।
মানুষ চায় বিনোদন।
আপনি তো ভবঘুরে আমার মনে হয়।
তা না হলে নীতি নৈতিকতা এখানে নয় গরিবদের জন্য মানসিকতা তৈরি করে এগিয়ে আসুন।


ধন্যবাদ
Quote
 
 
0 #1 মীর আহসান হাবীব 2014-08-24 12:25
ভাল লিখেছেন। অত্যন্ত সময়োপযোগী লিখে। নৈতিকতার সংজ্ঞা কি হতে পারেন এই বিষয়ে আপনার কাছ থেকে লেখা প্রত্যাশা করছি।
Quote
 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year