pic_ms_iacd7_16_en.jpg

বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

User Rating:  / 194
PoorBest 

খুব ছোটবেলায় টিভিতে বিতর্ক প্রতিযোগিতা দেখে মনে হতো যে এরা এত চিল্লাপাল্লা করে কেন। তখন এই জিনিসটা কি তা বুঝতাম না। যখন একটু বড় হলাম তখন নিজেই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে গেলাম। তখন জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা নিয়মিত করা হতো বাংলাদেশ টেলিভিশনে। দু-একবার গিয়েছিলাম বিটিভিতে এমন প্রতিযোগিতায়। এমন বিতর্ক এখনো হয় কি না জানি না। কারণ তেমন একটা টিভি দেখার সময় পাই না। বহুবছর পর এক বিতর্ক প্রতিযোগিতা দেখার সুযোগ হল। টিআইবির দুর্নীতি বিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয়ে গেল কয়েকদিন আগে। এমন বিতর্ক প্রতিযোগিতা কেন নিয়মিত হয় না বা সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন আয়োজন কেন হয় না তার আক্ষেপও হল।

জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে দুদিনব্যাপী দুর্নীতিবিরোধি ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতা শুরু করা হয়। যেখানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। এরপর শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক রিজওয়ান-উল-আলম। তারপর আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে টিআইবির অবস্থানপত্র পাঠ করেন কাজী সফিকুর রহমান। বলাই বাহুল্য যে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৪ উপলক্ষ্যে। এরপর মুক্ত আলোচনা পরিচালনার জন্য ড. ইফতেখারুজ্জামান মঞ্চে আসেন। তার বক্তব্যের মধ্যে বেশ কিছু উল্ল্যেখযোগ্য বিষয় জানা গেল। যেমন জেন্ডার সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। অমর্ত্য সেন তার বক্তব্যে একথা বলেছিলেন। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় আমরা অনেকদূর এগিয়েছি এবংএই অগ্রযাত্রায় আমাদের প্রধান বাধা দুর্নীতি। যেসকল দেশ সুশাসন নিশ্চিত করতে পেরেছে তারা নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছে।,তারা নারীর রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশগ্রহণে সমতা বিধান করেছে। বাংলাদেশে অনেক ব্যতিক্রমের মধ্যে একটি হচ্ছে সরকার পরিচালনায় বাংলাদেশ গত ২০ বছরে প্রধান ও বিরোধী দল প্রধান নারী ছিলেন। আমাদের দেশে দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতির কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন নারীরা। আমাদের সবাইকে এজন্য নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে।

মুক্ত আলোচনা পর্বে দেখলাম সারাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থী বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জানতে বা কথা বলতে চেয়েছেন। সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে এরা মোটেই অসচেতন নয়। আধুনিক জীবনের অনেক সুবিধাবঞ্চিতরাও এখানে তাদের সচেতনতার পরিচয় দিল। যে কথাগুলো বেশ উল্ল্যেখযোগ্য মনে হল সেগুলো একটু উদ্ধৃত না করে পারছি না। বাসনা চাকমা (রাঙ্গামাটি), পার্বত্য অঞ্চলের নারীদের অবস্থান তুলে ধরে বলেন ঐ অঞ্চলে নারীর নিরাপত্তা বঞ্চিত এবং পুরুষদের তুলনায় শিক্ষাবঞ্চিত। অনেক সময় তারা ইচ্ছেথাকা সত্ত্বেও পড়াশুনা চালিয়ে নিতে পারে না। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পড়াশুনায় নিরুৎসাহিত করা হয়। তাদেরকে যেন ছেলে বা মেয়ে হিসেবে তুলনা না করে মানুষ হিসেবে তুলনা করা হয় বাঘাইছড়িতে সম্প্রতি সেনাসদস্য কর্তৃক সহিংসতার স্বীকার হয় নারী। রক্ষক যদি এভাবে ভক্ষক হয় তাহলে বিচার পাওয়া যাবে কোথায়। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ণ না করার কারণে আমরা অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হচ্ছি। আলাদা কোন নারীশিক্ষা নীতিমালা করা যায় কিনা সে বিষয়ে তিনি জানতে চান।

আফরোজা ইয়েসমিন চাদনি, চাঁদপুর থেকে এসেছিলেন। তার বক্তব্য হচ্ছে পরিবার সাপোর্ট দিয়েছে বলেই নারীরা এদেশের প্রধান ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। কিন্তু তৃণমূলে বা সাধারণ পরিবারে কি মেয়েদের সাপোর্ট দেয়া হয়?

ইয়াসমিন খাতুন, রাজশাহী থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান মাত্র ৩৭ মিনিট সংরক্ষিত আসন থেকে কথা বলেন নবম সংসদে প্রথম তিনটি অধিবেশনে নারীরা, তাহলে নারী সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজনীয়তা কী? তাছাড়া ফরেনসিক বিভাগে কাজ করতে নারীরা ইচ্ছুক না, তাদের কিভাবে এনকারেজ করা যায়?

আ ন ফখরুল আলম ফরহাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান নারীর ক্ষমতায়ন আমরা কোথায় চাই, স্থানভেদে নাকি সর্বত্র?

খায়রুননাহার খেয়া, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। তার বক্তব্য হচ্ছে আমি সাপোর্ট পেয়েছি একমাত্র নারী হিসেবে আমার এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। আরও জানতে চান বাল্যবিবাহ থেকে সরে আসতে সরকারের ইচ্ছে কী?

ইসমত জাহান জানতে চানএখন পর্যন্ত কতজন নির্যাতনকারীর বিচার হয়েছে তার কোন হিসেব দেয়া সম্ভব? আইনের কার্যকর প্রয়োগ কবে পাওয়া যাবে যে কেউ বিচারের উর্ধে নয়’।

আসিফ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেএসেছিলেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন সঙ্ক্রান্ত হেল্পলাইন কেন পাওয়া যাচ্ছে না যা চালু করা হয়েছে। এসব থেকে প্রতিকার পাবার পথ অত্যন্ত কঠিন। কিভাবে হেল্পনাইল আরো উপযোগী করা যায় তা জানতে চেয়েছেন

বরিশাল বিএম কলেজ থেকে আসা এক শিক্ষার্থী বলেন, নারীদের গায়ে হাত তোলার অধিকার আছে এটা কেমন কথা? একটি বাস্তব ঘটনা উদ্ধৃত করে বলেন, বিএম কলেজে অনেক হলের সামনে মেয়েদের প্রবেশ নিষেধ। যে যুগে আমরা নারী অধিকার নিয়ে এত কিছু করি সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এর মানে কি। সেইসাথে পুরোহিতদের বা মাওলানাদের শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায় কি না তাও জানতে চান তিনি।

ফারজানা আক্তার রেশমা, ইবাইস ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান, কর্পোরেট লেভেলে মেয়েদের সাথে যেভাবে আচরণ করা হয় বা তাদের যেমন চোখে দেখা হয় তার প্রতিকার আছে কি?

আরিফ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া থেকে এসেছিলেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, নারী এবং পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি যতদিন বদলানো যাবে না ততদিন পর্যন্ত এমন সহিংসতা বা বৈষম্য চলতে থাকবে।

যুথি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান, গৃহস্থালি কাজে অর্থমূল্য আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় কি না। চাতাল নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের সুরাহা করা যায় কি না।

আদিবা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান, শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের হয়রানির প্রতিকার কিভাবে সম্ভব

মোঃ আল মিন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। তিনি সরাসরি সামনে উপবিষ্ট মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, সংসদে কি আপনারা লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কিনা যে কারণে আপনারা কিছু করতে পারছেন না।

মিজানুর রহমান, টাঙ্গাইল থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান, আমরা যদি দিনকেদিন সভ্য হচ্ছি, তাহলে শতকরা ১২ থেকে ১৫ তাংশে কেন নির্যাতন বাড়ছে?

মারুফুর রহমান মারুফ, শেরেবাংলা কৃষিবিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, আদালত মেয়েদের মামলা নেয় না। এক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার।

ইশরাত শারমিন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান, নারীদের সংরক্ষিত আসন দিয়ে তাদের হেয় করা হচ্ছে না?

মাহাবুবুল আলম সৌরভ, ইউল্যাব থেকে এসেছিলেন। তিনি জানতে চান, বিজ্ঞাপণে পণ্য হিসেবে নারীদের হরহামেশা উপস্থিতি দেখা যায়এটা বন্ধে কিছু করা যায় কি না?

এরপর দেখা গেল মন্ত্রী তাদের সবার উত্তর তাদের নাম ধরে একে একে দিলেন। এটাও একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা। মন্ত্রী যেভাবে নাম ধরে ধরে সকলের প্রশ্নের উত্তর দিলেন সেটার জন্য তিনি আসলেই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। তিনি সকলের নাম ধরে প্রশ্নের নোট নেন।

যদি সকল মন্ত্রকের মন্ত্রীদের নিয়ে এমন মুক্ত আলোচনা বা প্রশ্নোত্তর পর্বের আয়োজন এবং তা নিয়মিত করা যেত তাহলে মনে হয় জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটত। পরিবর্তন তো আর একদিনে হয় না। তাই না?

Comments   

 
+5 #2 Arifur Rahman 2016-12-11 10:20
সেটাই, এটা দুর্নীতির ব্যাপকতার সাপেক্ষে!
Quote
 
 
-4 #1 Md. Suruj Khan 2016-12-09 08:13
ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ে ধীর গতিতে এগোতে হবে।
Quote
 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year