pic_ms_iacd7_16_en.jpg

খাদ্যে ভেজাল ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি: নৈতিকতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই

User Rating:  / 19
PoorBest 
খাদ্য বাংলাদেশের নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের খাদ্য অধিকার লঙ্ঘিত হয়। নিরাপদ খাদ্য আবার খাদ্য নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশও বটে। তাই এটি নিশ্চিত করতে না পারলে সার্বিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হয়। বর্তমানে শাকসবজি, মাছ-মাংস থেকে ফলমূল এমনকি শিশুখাদ্য ও ঔষধে ভেজাল ও রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের হুমকিতে পরিণত করেছে। যদিও স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রায়ই এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জনসচেতনতা বাড়াচ্ছে কিন্তু এর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর টনক খুব কমই নড়ছে বলে প্রতীয়মান হয়। মাঝে মাঝে বাজারগুলোতে ভেজাল বিরোধী পরিদর্শন নাগরিকদের মনকে হাল্কা স্বস্তি দিলেও সেটির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্নও রয়েছে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে নানাবিধ দুরারোগ্য ব্যাধি ও জীবনহানির ঘটনা ঘটে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লক্ষ লোক খাদ্যে বিষস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
 
 
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সারা দেশের ২১,৮৬০ টি খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষায় পঞ্চাশ শতাংশ পণ্যে ভেজাল পাওয়া গেছে। ভেজাল খাদ্য খেয়ে অসুস্থ হওয়া, জটিল রোগের চিকিৎসায় দেশের বাইরে প্রচুর অর্থের খরচ সংশ্লিষ্ট পরিবারকে হুমকির মধ্যেও ফেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি ভেজাল প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে- নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩ প্রণয়ন, ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩ এর খসড়া প্রণয়ন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বাজার পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদারকরণ, এফবিসিসিআই-এর ব্যবস্থাপনায় ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন জেলার মোট ১৮টি কাঁচাবাজারকে ফরমালিনমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ সহযোগিতায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রকল্প গ্রহণ ও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে একটি স্বতন্ত্র খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে খাদ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা উল্লেখযোগ্য। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ তথা খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে এ সকল উদ্যোগসমূহ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই সন্তোষজনক নয়, কারণ খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি প্রতিবছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ফলে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা অব্যাহত থাকে। খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ করলেও ভেজালকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না এবং তদারকি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা, খাদ্যে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে গবেষণা হলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে তদারকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসনের সমস্যা সম্পর্কে গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় চিহ্নিত করার জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে।
 
 
গবেষণায় বলা হয়েছে, নিরাপদ খাদ্য আইন - ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রণয়ন হলেও গেজেট আকাওে প্রকাশ করে কার্যকর না করা, খাদ্য তদারকি ও পরিবীক্ষণের ক্ষেত্রে জনবলের স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি, ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তার সরাসরি মামলা করার বিধান না থাকা, ভোক্তার অভিযোগ নিরসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভোক্তা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কর্তৃক নমুনা পরীক্ষার ব্যয়ভার বহনের বাধ্যবাধকতা থাকা, ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নমুনা পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাব সর্বোপরি ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বন্ধ না হয়ে বরং বেড়েই চলেছে। এছাড়া ভেজালবিরোধী অভিযানের সময় ম্যাজিস্ট্র্রেটের উপর সংঘবদ্ধ হামলা বা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে চাকুরীক্ষেত্রে নাজেহালের চিত্রও আমরা অতীতে দেখেছি। দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীর বিরুদ্ধে ভেজাল খাদ্য তৈরীর অভিযোগ থাকার পরও ব্যবস্থা না নিয়ে বরং আরো বেশি প্রচারের মাধ্যমে কাটতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা দেশবাসীকে অবাক করছে।
 
 
গবেষণায় ওঠে এসেছে, নিরাপদ খাদ্যের তদারকি কার্যক্রমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিএসটিআই কাজের পরিধি ও ভৌগোলিক আওতা বিবেচনায় মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবলের অভাব রয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩১৯টি পৌরসভা ও ১১টি সিটি কর্পোরেশনে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ৩৭০টি স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৭৮ জন কর্মরত আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী সারা দেশে ৫৬৬ জন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর কর্মরত থাকলেও তাদের কাজের ক্ষেত্র ও পরিধি বিবেচনায় এই জনবল যথেষ্ঠ নয়। অপরদিকে ঢাকাসহ ৫টি বিভাগীয় শহরের বিএসটিআই এর মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনায় ফিল্ড অফিসারের ৬৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৮ জন। মাঠ পর্যায়ে এ সকল পদসমূহে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল স্বল্পতার কারণে নিরাপদ খাদ্যের নজরদারি কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
 
এছাড়া প্রতিবেদনে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর এবং বিএসটিআই এর ফিল্ড অফিসার কর্তৃক রেস্তোরা, বেকারী ও খুচরা বিক্রেতা পরিদর্শনে অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে শৈথিল্য প্রদর্শন; মাসিক ভিত্তিতে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর কর্তৃক বড় দোকানদার, রেস্তোরা ও বেকারীর মালিকের সাথে সমঝোতামূলক দুর্নীতি; নমুনা পণ্যেও নামে ব্যক্তিগত ভোগে ব্যবহার; ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কিছুসংখ্যক ইন্সপেক্টর কর্তৃক পরিদর্শন কার্যক্রমে নিজ উদ্যোগে সোর্স নিয়োগ এবং বেতন ও সুবিধাদি নিয়মবহির্ভুতভাবে আদায়; জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পরীক্ষাগারে পণ্যের নমুনা পরীক্ষা না করে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সনদ প্রদানের চিত্র উঠে এসেছে।
 
বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯ এ প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত স্থাপনের বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গঠনের বিষয়ে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের আদেশও বাস্তবায়িত হয়নি। উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত সারা দেশের মধ্যে একমাত্র ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন এলাকায় একটি মাত্র খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
আমাদের দেশে ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫) এ সর্বোচ্চ ১ বছর সশ্রম কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। অপরদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এ সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদ- বা অনধিক ২ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। নতুন প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ তে জরিমানা ও শাস্তির পরিমান বৃদ্ধি করে অনুর্ধ্ব ৫ বছর কারাদ- বা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান করা হলেও এখানে সশ্রম কারাদ-ের বিধান রাখা হয় নি। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে ভারতে যাবজ্জীবন,পাকিস্তানে ২৫ বছর কারাদ-, যুক্তরাষ্ট্রে সশ্রম কারাদ-ের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ কঠোর আইনের অভাবের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ভেজাল প্রতিরোধে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
 
এখানেই শেষ নয়। খাদ্য তদারকি ও পরিদর্শনে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব, লজিস্টিকস ও যানবাহনের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি, পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব, খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ-রক্ষনাবেক্ষনের সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মরতরা ইচ্ছা সত্ত্বেও দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করতে পারেন না। এছাড়া নজরদারির কার্যক্রম শুধূমাত্র মহানগরীগুলোতে দৃশ্যশান হলেও উপজেলা বা গ্রাম পর্যায়ে তা মোটেই লক্ষ করা যায় না। অথচ খাদ্যে সুরক্ষা পাবার অধিকার দেশের সকল নাগরিকের সমানভাবে রয়েছে। খাদ্যে ভেজাল ও জনস্বাস্থ্যের হুমকি: নৈতিকতা, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই
 
খাদ্য বাংলাদেশের নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে জনগণের খাদ্য অধিকার লঙ্ঘিত হয়। নিরাপদ খাদ্য আবার খাদ্য নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশও বটে। তাই এটি নিশ্চিত করতে না পারলে সার্বিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হয়। বর্তমানে শাকসবজি, মাছ-মাংস থেকে ফলমূল এমনকি শিশুখাদ্য ও ঔষধে ভেজাল ও রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার বৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের হুমকিতে পরিণত করেছে। যদিও স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রায়ই এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জনসচেতনতা বাড়াচ্ছে কিন্তু এর প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর টনক খুব কমই নড়ছে বলে প্রতীয়মান হয়। মাঝে মাঝে বাজারগুলোতে ভেজাল বিরোধী পরিদর্শন নাগরিকদের মনকে হাল্কা স্বস্তি দিলেও সেটির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্নও রয়েছে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে নানাবিধ দুরারোগ্য ব্যাধি ও জীবনহানির ঘটনা ঘটে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লক্ষ লোক খাদ্যে বিষস্ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
 
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সারা দেশের ২১,৮৬০ টি খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষায় পঞ্চাশ শতাংশ পণ্যে ভেজাল পাওয়া গেছে। ভেজাল খাদ্য খেয়ে অসুস্থ হওয়া, জটিল রোগের চিকিৎসায় দেশের বাইরে প্রচুর অর্থের খরচ সংশ্লিষ্ট পরিবারকে হুমকির মধ্যেও ফেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি ভেজাল প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে- নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩ প্রণয়ন, ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৩ এর খসড়া প্রণয়ন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বাজার পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদারকরণ, এফবিসিসিআই-এর ব্যবস্থাপনায় ঢাকা মহানগরীসহ বিভিন্ন জেলার মোট ১৮টি কাঁচাবাজারকে ফরমালিনমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ সহযোগিতায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে প্রকল্প গ্রহণ ও জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে একটি স্বতন্ত্র খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে খাদ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনা উল্লেখযোগ্য। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ তথা খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে এ সকল উদ্যোগসমূহ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই সন্তোষজনক নয়, কারণ খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি প্রতিবছরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাময়িক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ফলে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা অব্যাহত থাকে। খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণ করলেও ভেজালকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না এবং তদারকি সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে ভেজাল খাদ্যের ব্যাপকতা, খাদ্যে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে গবেষণা হলেও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে তদারকি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসনের সমস্যা সম্পর্কে গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় চিহ্নিত করার জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে।
 
গবেষণায় বলা হয়েছে, নিরাপদ খাদ্য আইন - ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রণয়ন হলেও গেজেট আকাওে প্রকাশ করে কার্যকর না করা, খাদ্য তদারকি ও পরিবীক্ষণের ক্ষেত্রে জনবলের স্বল্পতা, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ঘাটতি, ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তার সরাসরি মামলা করার বিধান না থাকা, ভোক্তার অভিযোগ নিরসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভোক্তা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কর্তৃক নমুনা পরীক্ষার ব্যয়ভার বহনের বাধ্যবাধকতা থাকা, ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, নমুনা পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাব সর্বোপরি ভেজাল খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন বন্ধ না হয়ে বরং বেড়েই চলেছে। এছাড়া ভেজালবিরোধী অভিযানের সময় ম্যাজিস্ট্র্রেটের উপর সংঘবদ্ধ হামলা বা সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে চাকুরীক্ষেত্রে নাজেহালের চিত্রও আমরা অতীতে দেখেছি। দেশের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানীর বিরুদ্ধে ভেজাল খাদ্য তৈরীর অভিযোগ থাকার পরও ব্যবস্থা না নিয়ে বরং আরো বেশি প্রচারের মাধ্যমে কাটতি বাড়ানোর প্রচেষ্টা দেশবাসীকে অবাক করছে।
 
গবেষণায় ওঠে এসেছে, নিরাপদ খাদ্যের তদারকি কার্যক্রমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিএসটিআই কাজের পরিধি ও ভৌগোলিক আওতা বিবেচনায় মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবলের অভাব রয়েছে। বর্তমানে দেশের ৩১৯টি পৌরসভা ও ১১টি সিটি কর্পোরেশনে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী ৩৭০টি স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের পদ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৭৮ জন কর্মরত আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী সারা দেশে ৫৬৬ জন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর কর্মরত থাকলেও তাদের কাজের ক্ষেত্র ও পরিধি বিবেচনায় এই জনবল যথেষ্ঠ নয়। অপরদিকে ঢাকাসহ ৫টি বিভাগীয় শহরের বিএসটিআই এর মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনায় ফিল্ড অফিসারের ৬৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৮ জন। মাঠ পর্যায়ে এ সকল পদসমূহে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল স্বল্পতার কারণে নিরাপদ খাদ্যের নজরদারি কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়ে পড়ে।
 
এছাড়া প্রতিবেদনে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর এবং বিএসটিআই এর ফিল্ড অফিসার কর্তৃক রেস্তোরা, বেকারী ও খুচরা বিক্রেতা পরিদর্শনে অনৈতিক লেনদেনের বিনিময়ে শৈথিল্য প্রদর্শন; মাসিক ভিত্তিতে স্যানিটারী ইন্সপেক্টর কর্তৃক বড় দোকানদার, রেস্তোরা ও বেকারীর মালিকের সাথে সমঝোতামূলক দুর্নীতি; নমুনা পণ্যেও নামে ব্যক্তিগত ভোগে ব্যবহার; ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কিছুসংখ্যক ইন্সপেক্টর কর্তৃক পরিদর্শন কার্যক্রমে নিজ উদ্যোগে সোর্স নিয়োগ এবং বেতন ও সুবিধাদি নিয়মবহির্ভুতভাবে আদায়; জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পরীক্ষাগারে পণ্যের নমুনা পরীক্ষা না করে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে সনদ প্রদানের চিত্র উঠে এসেছে।
 
বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯ এ প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত স্থাপনের বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত তা করা হয়নি। এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গঠনের বিষয়ে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের আদেশও বাস্তবায়িত হয়নি। উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত সারা দেশের মধ্যে একমাত্র ঢাকা দক্ষিন সিটি কর্পোরেশন এলাকায় একটি মাত্র খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
 
আমাদের দেশে ভেজাল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ১৯৫৯ (সংশোধিত ২০০৫) এ সর্বোচ্চ ১ বছর সশ্রম কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। অপরদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এ সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদ- বা অনধিক ২ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। নতুন প্রণীত নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ তে জরিমানা ও শাস্তির পরিমান বৃদ্ধি করে অনুর্ধ্ব ৫ বছর কারাদ- বা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দ-ের বিধান করা হলেও এখানে সশ্রম কারাদ-ের বিধান রাখা হয় নি। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হয়। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর অপরাধে ভারতে যাবজ্জীবন,পাকিস্তানে ২৫ বছর কারাদ-, যুক্তরাষ্ট্রে সশ্রম কারাদ-ের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ কঠোর আইনের অভাবের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ভেজাল প্রতিরোধে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
 
এখানেই শেষ নয়। খাদ্য তদারকি ও পরিদর্শনে প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব, লজিস্টিকস ও যানবাহনের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি, পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব, খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ-রক্ষনাবেক্ষনের সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মরতরা ইচ্ছা সত্ত্বেও দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করতে পারেন না। এছাড়া নজরদারির কার্যক্রম শুধূমাত্র মহানগরীগুলোতে দৃশ্যশান হলেও উপজেলা বা গ্রাম পর্যায়ে তা মোটেই লক্ষ করা যায় না। অথচ খাদ্যে সুরক্ষা পাবার অধিকার দেশের সকল নাগরিকের সমানভাবে রয়েছে।
 
পরিশেষে বলা যায়, দেশের প্রতিটি মানুষের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সরকারকে উপরেল্লিখিত কারণগুলো পর্যবেক্ষণ করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়ার কোন বিকল্প নেই। নিরাপদ খাদ্য আইন,২০১৩ এর বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ সংশোধন করে দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা, ভোক্তা পর্যায়ে সরাসরি আইনী পদক্ষেপ নেয়ার বিধান চালু এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় আইনী সহায়তা বাধ্যতামূলক করে ভোক্তা অধিকার আইন সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর প্রয়োজনীয় সংস্কার, প্রতিটি জেলা ও মহানগরে খাদ্য আদালত গঠন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএসটিআই ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় সাধন করার মাধ্যমে সরকারি পদক্ষেপ এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা বজায় রেখে ব্যবসা এবং গণমাধ্যমের সরব নজরদারির মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধিরও কোন বিকল্প নেই। #
 
(লেখক: মোঃ শাহনূর রহমান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর রিসার্চ এণ্ড পলিসি বিভাগে এবং মামুন আ. কাইউম আউটরিচ এণ্ড কমিউনিকেশন বিভাগে কর্মরত)
 
 

 

Comments   

 
0 #1 Md. Asaduzzaman 2015-04-22 14:23
অামরা যারা নিতান্তই গরীব, দরিদ্র অামরা অনেকেই কলম্ব মাছ নামে এক ধরনের মাছ বাজার থেকে কিনে খেয়ে থাকি। যা বাজারে কার্টুনে করে বিক্রি করা হয়। প্রশ্ন হল এই মাছে কোন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয় কিনা বা ' হয়ে থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য কতটুকু নিরাপদ। স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকলে কোন ব্যবস্থা নেয়া জরুরী কিনা?
Quote
 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year