pic_ms_iacd7_16_en.jpg

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ও তার সমাধান

User Rating:  / 5
PoorBest 

দক্ষিণ এশিয়ায় সমাজের বিভিন্ন স্তরে উগ্র মৌলবাদ এখন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই মৌলবাদ চরমবাদে এবং চরমবাদ জঙ্গিবাদে রূপ নিচ্ছে। নির্মোহ বাস্তবতা হল, জঙ্গিবাদ এবং জঙ্গিবাদের সম্ভাব্য উত্থান এই অঞ্চলের শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সভ্যতার জন্য বড় আকারের হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে জঙ্গিবাদ বিস্তারের পরিধির তারতম্য থাকলেও এর পিছনে রাজনৈতিক ভূমিকা প্রায় একই। অপরাজনীতির কারণেই আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো সমাজে জঙ্গিবাদের শিকড় খুব গভীরে। উদাহরণস্বরূপ, এই দুটি দেশেই জঙ্গি গোষ্ঠী এবং তাদের সমর্থকরা জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখে। ভারতেও উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কারণে গুজরাটের দাঙ্গা এবং অতিসম্প্রতি সংখ্যালঘু মুসলিম এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের গরিব মানুষদের নানা সরকারি সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে হিন্দুত্বকরণ হচ্ছে। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ জঙ্গিবাদে রূপ না নিলেও দেশটির বহু প্রদেশেই রাজনৈতিক জঙ্গিবাদ রয়েছে। তেমনি এখন শুরু হলো বাংলাদেশে। কিন্তু কেন? নেপথ্যে কি? প্রশ্ন এখন জনমনে (?) সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় প্রশ্ন তো আসতেই পারে। 
যারা সমাজতন্ত্রের ছত্র-ছায়ায় সন্ত্রাস করে তারা হয় বিপ্লবী আর যারা ইসলামের ছত্র-ছায়ায় সন্ত্রাস করে তারা হয় জঙ্গি। কিন্তু এই দুই ধরণের সন্ত্রাসের উদ্দেশ্যই এক। শাসকশ্রেণীকে উচ্ছেদ করে তাদের অনুসারীদের মতাদর্শের সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কেন এই বিপ্লববাদ কেন এই জঙ্গিবাদ? কারা এই বিপ্লবী কারা এই জঙ্গি? শুধু ঘটনার চারপাশে ঘুরঘুর করলে চলবেনা। ঘটনার মূলে যেতে হবে।

দেশে জঙ্গি বাদ উত্থান কেনো?

১। একটি দেশের সরকার যখন ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কাজে পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বিরোধী মত প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে তখনই এ ধরনের সহিংসতা বেড়ে যায় ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। 
অতীতে আমাদের দেশের জঙ্গি উত্থানের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ক্ষেত্রবিশেষে জঙ্গিরা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছে। তাদেরকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা চলেছে। অর্থাৎ জঙ্গিবাদ আবর্তিত হয়েছে কার্যত ‘রাজনীতি’কে কেন্দ্র করেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ধর্মভিত্তিক’ রাজনৈতিক দলের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ধর্মের নামে পরিচালিত এসব রাজনৈতিক দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব ধর্মভিত্তিক দল এখন কোণঠাসা হয়ে আছে। কিছু কিছু দল কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ড দলে পরিণত হয়েছে। সুতরাং যে কোনো প্রকারে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারলে এসব আন্ডারগ্রাউন্ড দলের সুবিধা হবে এ কথা বলা যায় নিশ্চিতভাবেই।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকে বলছেন- প্রথমত রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হলে, দ্বিতীয়ত কার্যকরী বিরোধী দল থাকলে ও তৃতীয়ত মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করা সম্ভব। অর্থাৎ জঙ্গিবাদকে তারা দেখছেন রাজনৈতিক সঙ্কট হিসেবে, এবং সমাধানও দিতে চেষ্টা করছেন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
তাদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, জঙ্গিবাদকে প্রচলিত অর্থে রাজনৈতিক সঙ্কট ভাবলে ভুল হবে। এ সঙ্কট আদর্শিক। জঙ্গিমাত্রই একটি বিকৃত আদর্শকে ধারণ করে, লালন করে, যে বিকৃত আদর্শের জন্ম হয়েছে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা থেকে। সুতরাং ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা নিশ্চিত করে আদর্শিকভাবে তাদের মোকাবেলা করার পথে না হেঁটে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক মোকাবেলা করতে গেলে তা হবে প্রকৃতিবিরুদ্ধ সিদ্ধান্ত, রোগকে পাশ কাটিয়ে উপসর্গের চিকিৎসা করার মতো।
বীজ থাকলে চারা গজাবেই, প্রয়োজন শুধু সঠিক মৌসুম ও উপযুক্ত পরিবেশ। জঙ্গিবাদ নামক বিষবৃক্ষের বীজ হলো ‘ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা’। আর উপযুক্ত মৌসুম নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা আমাদের দেশে অতীতেও ছিল, এখনও আছে, অনেকটা সুপ্ত বীজের মতো। উপযুক্ত পরিবেশ যখনই এসেছে সেই বীজ থেকে চারা গজিয়েছে। এখানে পরিবেশের মাহাত্ম্য অবশ্যই আছে, কিন্তু আসল মাহাত্ম্য বীজের, যাকে আমরা সর্বদা বিবেচনার বাইরেই রেখে থাকি। সেই অসংখ্য বীজকে, সমস্যার মূলকে অক্ষত রেখে আমরা যদি চারাকেই একমাত্র বিবেচ্য বলে ধরে নেই, তাহলে আমাদের ধারণা অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে, আর অপূর্ণাঙ্গ ধারণাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ভুল হবে এতে অবাক হবার কিছু নেই।
আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অন্তত দুইটি পক্ষকে আমরা সর্বদাই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত থাকতে দেখি। তাদের চেষ্টা থাকে যে কোনো জাতীয় ইস্যুকে ব্যবহার করে দলীয় সুবিধা আদায়ের। জঙ্গিবাদও নিঃসন্দেহে বড় একটি ইস্যু। একে লুফে নিতে ছাড়ে না কোনো পক্ষই, কেবল খেয়াল রাখা হয়, কীভাবে বা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচার-প্রচারণা চালালে নিজেদের সুবিধা হয় আর প্রতিপক্ষের ক্ষতি হয়। এ করতে গিয়ে ইস্যুটির যে গুরুত্ব প্রাপ্য ছিল, তা নষ্ট হয়ে কেবলই রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের একটা মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। জঙ্গিবাদ আসলে কী, কেন মানুষ জঙ্গি হয়, এর মোকাবেলার প্রকৃত উপায় কী- সেসব প্রশ্ন চাপা পড়ে যায় পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি, অভিযোগ ও অপবাদের আড়ালে। আদৌ জঙ্গি আছে কি নেই- সেটাই হয়ে দাঁড়ায় মুখ্য বিষয়। কারও সুবিধা ‘জঙ্গি আছে’ প্রমাণিত হলে, আবার কারও সুবিধা হয় ‘জঙ্গি নাই’ প্রমাণে। এই ফাঁকে জঙ্গিরা তলে তলে ঠিকই সংগঠিত হয়ে যায়। 
সুতরাং জঙ্গিবাদের উত্থানে রাজনৈতিক ভূমিকা যদি থাকে সেটা এই যে, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যহীনতা ও স্বার্থপরের রাজনীতি জঙ্গিবাদ উত্থানের সহজ পরিবেশ তৈরি করে দেয়। যদি আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন হতো যে, জাতির সুদূরপ্রসারী কল্যাণের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো থাকতো ঐক্যবদ্ধ, জঙ্গিবাদকে নিছক দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে দেখা হতো জাতীয় সঙ্কট হিসেবে তাহলে জঙ্গিবাদের উত্থান অনেক কঠিন হয়ে পড়ত।
২। ঈদ/পুঁজা হউক আর অন্য কোন উৎসব হউক, খুশি সবার ঘরে সমান নয়। যার টাকা যত বেশি তার উৎসব তত দামী। যার টাকা কম তার ইচ্ছে থাকলেও উপায় থাকে না দামী উৎসব করার। আর যারা গরিব যারা দিন আনে দিন খায়। আজ কাজ করছে তো পেট ভরছে। কাল যদি কাজ না পায় তো খেতে পাবে না। তার কাছে ঈদ/পুঁজা বা অন্য কোন উৎসব কি আনন্দ না বিষাদ! তার সন্তানরা কত খানি উৎসব উপভোগ করতে পারে! সমাজে সবার জীবন যাত্রা এক নয়। কেউ সারা দিন খেটে খুটে মৌলিক চাহিদা গুলি মেটাতে পারে না, আবার কেউ বসে বসে আয়েশি জীবন কাটিয়েও সুখ পায় না!

এই ধরনের ভারসাম্যহীন সমাজ কারও কারও মন জগতকে উস্কে দেয়, কেউ কেউ এই সব ভারসাম্যহীনতা মেনে নিতে পারে না। আমরা স্কুল কলেজে যে পাঠ্য বইগুলি পড়ি। সেই পাঠ্য বইগুলিতে প্রাপ্ত শিক্ষা আর বাস্তবতার মিল কত খানি থাকে? যখন মিল পায়না তখনই অনেকে হীনমন্যতায় ভোগে। যারা আবেগই তারায় কষ্ট-পায়। তারা পরিবার, তারা সমাজ, তারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বারায়। কেউ কলম হাতে, কেউ মাদক হাতে, কেউ অস্ত্র হাতে প্রতিবাদী হয়। ছন্নছাড়া জীবন যাপন শুরু করে। তারা পরিবর্তনের স্বপ্ন লালন করে, সমাজকে পরিবর্তনের, রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের।
সারা জীবন ঘুষ-দুর্নীতি করল, সেই ঘুষ-দুর্নীতির টাকায় এতিমখানা-মাদ্রাসা-আশ্রম-মসজিদ-মন্দিরে দান! শেষ কালে হজ্জ করে হাজী! শেষ কালে তীর্থযাত্রা করে পরম ধার্মিক!! জোব্বা টুপি! টিকি! উফ্! কি শিক্ষা পেল তার কাছে তার সন্তানরা, তার প্রতিবেশীরা, তার সমাজ? ধর্মকে, ধর্মের আদর্শকে আর কত খানি তামাশা বানিয়ে ফেললে সমাজের চোখে ঘুঁত লাগবে! 

আজ সমাজটাকে নিয়ে ভাবলে যে কোন বিবেকবান মানুষের মতি ভ্রষ্ট হবে। বাসে, ট্রাকে, অফিসে, আদালতে, মাঠে, ঘাটে, ব্যবসা, বাণিজ্যে সর্বত্র; চান্স পেলেই উপরি ইনকামের ধান্দা! যা পুরপুরি অনৈতিক। এই সকল অনেকে মেনে নিতে পারে না। অনেক কিশোর মনে, তরুণ মনে এগুলির প্রভাব ফেলে। যখন দেখে বাস্তবতায় পাঠ্য বইপুস্তকের বা ধর্মগ্রন্থগুলির নীতিকথার কোন মূল্য নাই। মূল্য শুধু পরীক্ষার উত্তর পত্রে বেশি নাম্বার পেতে। তখন অনেকে সমাজ পরিবর্তনের চেতনা লালন করে। এক সময় তারা পরিবর্তনের পথ খোঁজে। কেউ তুলে নেয় কলম, কেউ অস্ত্র, কেউ মাদক। হয়ে যায় মাদকাসক্ত। হয়ে যায় ছন্নছাড়া। হয়ে যায় বিপ্লবী বা জঙ্গি।

২। বাবা মা দুজনেই ব্যস্ত। সময় দিতে পারে না তাদের সন্তান কে। তার খেলার সাথী সেই পরিবারের কাজের ছেলে বা মেয়েটি তার মত পরিবেশ পায় না। এটা কোন কোন সন্তানের মনে আবেগের সঞ্চার ঘটায়। সমাজ এমন কেন? মা তাকে মেঝেতে ঘুমাতে দেয় কেন? তাকে উচ্ছিষ্ট খাবার দেয় কেন? তার সাথে ভালো ব্যবহার কেন সবাই করে না! এই বিষয় গুলাও অনেকের ভাবনায় প্রভাব ফেলে। যে সংসারে বাবা মা এই দুজনের মতের মিল নাই। তাদের মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকে, সেই পরিবার যেমন সুস্থ না ঠিক সেই পরিবারের সন্তানরা সুস্থ-স্বাভাবিক না। তারা পরিবারের প্রতি বিরূপ হয়ে থাকে। হীনমন্যতায় ভোগে। তারা মাদকাসক্ত হয়। তারা বেপরোয়া হয়। তারা না অপরোধের সাথে জড়িয়ে পড়ে। ঠিক এসময়েই তার সঙ্গী যে কেউ হতে পারে। তার জ্ঞান থাকে কম । আর এ অল্প জ্ঞানকেই কাজে লাগায় জঙ্গিরা।
৩। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের পেছনে মাদ্রাসা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়ী করা হলেও সম্প্রতি গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পর জঙ্গীবাদের নতুন ধারা দেখা যাচ্ছে। এই হামলাকারীরা উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত বা ধনী পরিবারের সন্তান।

বাংলাদেশের এই তরুণরা উন্নত জীবন এবং উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে ছুঁড়ে ফেলে জঙ্গীবাদের পথে পা বাড়াচ্ছে।

গুলশান এবং শোলাকিয়া হামলায় জড়িত অন্তত দুজন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। আগে কয়েকটি জঙ্গি হামলায়ও একই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের নাম এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ঘুরে এখানকার শিক্ষার্থীদের দেখে অবশ্য বিশ্বাস করা কঠিন যে এরকম পরিবেশে তারা জঙ্গীবাদি হতে পারে। এখানকার শিক্ষার্থীরা মনে করেন ব্যক্তিগত জীবনে যে কেউ উগ্রবাদে জড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসনের শিক্ষার্থী শাহেদা বলেন, “নিব্রাস কিন্তু ড্রপআউট ছিল নর্থসাউথ থেকে। মালয়েশিয়া গিয়ে তার ব্রেইনওয়াশটা হয়েছে।”

নর্থ সাউথের নাম বার বার আসায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ফাহিম বলেন, “একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এইটিন প্লাস। সে নিজেই জাজ করতে পারে কোনটা রাইট কোনটা রং। মোটিভেশনটা সম্পূর্ণ ওই ছাত্রের ওপরই নির্ভর করে। এক্ষেত্রে ইন্টারনেট একটা বড় যোগাযোগ মাধ্যম।”

আরেক ছাত্র বলেন, “এমনভাবে ব্রেইনওয়াশটা করা হয়, কেউ ওখান থেকে সরে আসতে পারে না। যার কারণে ওরা আত্মঘাতী হয়ে যায়”।এসব জঙ্গি কার্যক্রমের সাথে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে ইসলাম এবং রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করেন ড. মোবাশ্বার হাসান।

তিনি বলেন, “ইসলামে একটা কনসেপ্ট আছে মুসলিম উম্মাহ। এই উম্মাহ ধারণাটা হলো মুসলিমরা ভাই ভাই। এরকম ধারণা ওরা ব্যবহার করছে। তারা বলে যে ফিলিস্তিনে দেখ, ইরাক বা সিরিয়াতে দেখ তোমার ভাই-বোনেরা কিভাবে নিগৃহীত হচ্ছে পশ্চিমাদের দ্বারা”।

হাসানের পর্যবেক্ষণে ইঞ্জিয়ারিং এবং ব্যবসায় প্রশাসনের মতো বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়া তরুণদের জঙ্গি তৎপরতায় সংশ্লিষ্ঠতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

“উগ্রবাদী বহু ধরনের ব্যাখ্যা ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ওয়াহাবি সালাফি... এদের কথাবার্তাতো খুবই সোজাসাপ্টা। একটা কারণ হতে পারে যেহেতু তাদের একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক বেশি সায়েন্স অরিয়েন্টেড অনেক বেশি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট, যে দুই যোগ দুই চারই হবে বা কোনো সূত্র দিলে ওই ধরনের কাজই হবে। এই কারণেও হতে পারে যে তারা ধর্মের যে সহজ ব্যাখ্যা তারা সেটাই নিচ্ছে।”


এই রকমের অনেক উদাহরণের ভিতরে একটা কথা সত্য যে, অনিয়ম সবায় মেনে নিতে পারে না। যারা পারে না তারা হয় প্রতিবাদী তারা বিদ্রোহী। তারা হয় জঙ্গি তারা বিপ্লবী। তারা পরিবর্তনের স্বপ্ন লালন করে, সমাজকে পরিবর্তনের রাষ্ট্রকে পরিবর্তনের।

পরিত্রানের উপায় বলা কঠিন তবে কিছু কথা না বললেই নয়,
বিকৃত ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম: ভস্মে ঘৃতাহুতি দেয়া
জঙ্গিরা যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে, জেলে যাচ্ছে, ফাঁসিতে ঝুলছে, শত্র“র গোলা-বারুদে ঝাঁঝরা হচ্ছে সেই ইসলাম আর আল্লাহর রসুলের ইসলাম এক নয়। বর্তমানে ইসলামের নাম করে যে দ্বীনটি প্রচলিত আছে তা বাহ্যিক দৃষ্টিতে প্রকৃত ইসলামের মতো মনে হলেও, আত্মায় ও চরিত্রে আল্লাহর রসুলের ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। যেটাকে আইএস, বোকো হারাম, আল কায়েদা, ইখওয়ান, তালেবানরা ইসলাম মনে করছে এবং ভাবছে সেটাকে প্রতিষ্ঠা করে স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনবে সেটা বিগত ১৩০০ বছরের ধারাবাহিক বিকৃতির ফল, প্রকৃত ইসলামের ছিটে ফোটাও এর মধ্যে নেই। দীন নিয়ে অতি বিশ্লেষণকারী আলেম, মুফতি, মোফাস্সের, মোহাদ্দেস, সুফি, দরবেশ ও পীর-মাশায়েখদের অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্ক, বাহাস, মতভেদ ও চুলচেরা বিশ্লেষণের পরিণামে দীনের ভারসাম্য হারিয়ে গেছে অনেক আগেই, সেই ভারসাম্যহীন দীনের ভিন্ন ভিন্ন ভাগকে আঁকড়ে ধরে ছিল ভিন্ন ভিন্ন ফেরকা-মাজহাব, দল-উপদল। এর মধ্যে ইসলাম পারস্যে প্রবেশ করলে সেখানকার পূর্ব থেকে বিরাজিত বিকৃত আধ্যাত্মবাদ ইসলামে প্রবেশ করল। বিকৃত সুফীবাদী ধ্যান-ধারণার প্রভাবে এক সময়ের প্রগতিশীল, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামী, বহির্মুখী, প্রগতিশীল, উদার, যুক্তিপূর্ণ ইসলাম অন্তর্মুখী, গতিহীন, অযৌক্তিক, পলায়নপর সাধু-সন্ন্যাসের ধর্মে পরিণত হলো। তারপর আসল ব্রিটিশরা। তারা এই জাতির কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকল। আগের শিক্ষাব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে নিজেরা মাদ্রাসা তৈরি করে সেই মাদ্রাসায় ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের তৈরি সিলেবাস ও কারিকুলাম অনুযায়ী তাদের সুবিধামতো একটি বিকৃত ইসলাম এই জাতিকে শিক্ষা দিল। ফলাফল- মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ করে রসুলাল্লাহর রেখে যাওয়া ঐক্যবদ্ধ জাতি এখন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন, তেহাত্তর ফেরকায় বিভক্ত হয়ে একে অপরের রক্তে হোলি খেলছে। ব্রিটিশদের শেখানো এই বিকৃত ইসলাম পৃথিবীর এক ইঞ্চি মাটিতেও শান্তি আনয়ন করতে ব্যর্থ। সুতরাং একে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যারা জীবন দেবে, সম্পদ দেবে তারা যে ভস্মে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন তাতে সন্দেহ নেই।

জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করতে হবে কোর’আন-হাদীস দিয়ে, সেক্যুলারিজম দিয়ে নয়।
চমৎকার বলেছেন তিনি। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়টিকে কীভাবে নিবেন জানি না, তবে সমাধান এটাই। পূর্বেই বলেছি- জঙ্গিবাদ একটি আদর্শ, এবং অবশ্যই ভ্রান্ত আদর্শ। এই আদর্শের বীজকে অঙ্কুরিত হবার পূর্বেই মূলোৎপাটন করার এর চেয়ে কার্যকরী কোনো পদ্ধতি নেই। 
আমরা বিপর্যয়ের গভীরে তাকাই না। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকেই ‘নিরপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তারপর বিচারকার্য শুরু করলে সে বিচারের কার্যকারিতা তো থাকেই না, বরং বিচারকের উপর বিচারপ্রার্থীর আস্থা হারিয়ে যায়। গণতন্ত্রকেই যারা প্রকাশ্যে ‘কুফরি বা তাগুতি’ মতবাদ বলে প্রচার করে, পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থাকে তাগুতের শিক্ষাব্যবস্থা বলে ঘৃণা করে, ধর্মনিরপেক্ষতা যাদের অন্তরের বিষ, তাদের মোকাবেলা করার জন্য সেই গণতন্ত্র, সেই ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি কপচানো কিংবা সেই পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা কাজে লাগানোর কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না। 
জঙ্গিদের বিশ্বাস কেবল কোর’আন-হাদীসে। কোর’আন হাদীসে জেহাদের কথা আছে, কেতালের কথা আছে, সে কারণে তারা জেহাদে প্রবৃত্ত হয়েছে। এখন আপনি যদি তাদের যুক্তি প্রদান করেন যে, কোর’আন-হাদীসে থাকলেও বাংলাদেশ সংবিধানে যেহেতু জেহাদের কথা নেই, সুতরাং এই কাজ অসাংবিধানিক, বাংলাদেশের দন্ডবিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধও বটে, অতএব তোমরা এই কাজ করো না, তাহলে কোনো সুফল আসবে কি? তারা মানবে কি? কখনই মানবে না। কিন্তু মানতে বাধ্য হবে যদি তাদের বিশ্বাসের আধার কোর’আন-হাদীসকে রেফারেন্স করেই এ সত্য দেখিয়ে দেওয়া যায় যে, জেহাদের নামে তারা যা করছে তা কোর’আনসম্মত নয়, হাদীসসম্মত নয়, অর্থাৎ অনৈসলামিক। এ কাজটিই এখন করা দরকার। জঙ্গিবাদ নির্মূলে যারা কথিত রাজনৈতিক সমাধানের বৃত্তে আটকে আছেন তারা যত দ্রুত এ বিষয়টির মূলে প্রবেশ করে জঙ্গিদেরকে আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারবেন ততই জাতির মঙ্গল।


জাতিকে আগে তওহীদের জ্ঞান প্রদান করতে হবে
জঙ্গি মনোভাবসম্পন্ন মানুষদেরকে তওহীদের প্রকৃত অর্থ বোঝাতে হবে। দীনের ভিত্তি বা প্রাণ হলো তওহীদ। জীবনের সকল অঙ্গনে যেখানে আল্লাহ ও আল্লাহর রসুলের কোনো কথা আছে, সেখানে অন্য কারোটা না মানাই তওহীদের একমাত্র দাবি। সেই তওহীদ কি আজকের মুসলিম নামধারী জাতির মধ্যে আছে? নেই। আজ এই জাতি জাতীয় জীবন থেকে আল্লাহর হুকুম, বিধি-বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সিস্টেম গ্রহণ করেছে। ইসলাম বলতেই এরা বোঝে নামাজ, রোজা, এবাদত-উপাসনা এবং জিকির-আজগার, তসবীহ-তাহলীল, ওযু, গোসল, মেসওয়াক বা লেবাসের মতো তুচ্ছ ব্যক্তিগত জিনিস। অথচ আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে, দীনের ব্যক্তিগত ভাগ মেনে ও জাতীয় ও সামষ্টিক ভাগ প্রত্যাখ্যান করে এরা যে তওহীদ থেকেই বিচ্যুত হয়ে গেছে, আল্লাহর চোখে এরা আর যে মো’মেন নেই, মুসলিম নেই, বরং মোশরেকে পরিণত হয়েছে সে জ্ঞান তাদের নেই। কাজেই যারা পুনরায় ইসলামের স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনতে চায় তাদেরকে একদিকে যেমন নিজেদের অবস্থান বুঝতে হবে, সেই সাথে বুঝতে হবে জাতি বর্তমানে কোন অবস্থানে আছে। যে জাতিতে তওহীদই নেই, যারা জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুম, ন্যায় ও সত্যকে অস্বীকার করেছে তাদেরকে তওহীদের আহ্বান না জানিয়ে, তওহীদের মর্মার্থ না বুঝিয়ে অর্থাৎ মানসিকভাবে জাতিকে আল্লাহর বিধান গ্রহণ করার উপযোগী না করে আগেই জেহাদের জিগির তোলা সুবিবেচনার কাজ হতে পারে না। জাতিকে আগে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝাতে হবে। ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজ থেকে অশান্তি দূর করার জন্য সংগ্রাম করাই যে একজন মু’মিনের প্রধান কর্তব্য, এবাদত সেটা সকলকে বোঝাতে হবে। তাদেরকে আরও বোঝাতে হবে যে, ধর্মের কোনো বিনিময় চলে না, ব্যবসা চলে না। ধর্মের কাজ হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। এভাবে জাতিকে আগে ধর্ম-অধর্মের পার্থক্য, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য, তওহীদ, শিরক, কুফর ইত্যাদি সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে হবে। যুগ যুগ ধরে এদের বিশ্বাসে, আচারে, প্রথায় যে অজ্ঞতা বাসা বেধেছে তা দূরীভূত করতে হবে। তা না করে যাদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম, সেই সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরা চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় প্রদান করে। এভাবে যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ শান্তি আনয়ন সম্ভব নয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ গত দুই-এক দশকের ভেতরেই পাওয়া যাবে।

আইনের শাসন ফিরিয়ে দেওয়া

এটা অন্যতম সমস্যা। আইনের সঠিন শাসন না থাকার ফলে এতো দিন অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে। আইনের মারপ্যাচ জটিল থেকে ভয়ংকর হয়ে পড়ছে। ফলস্বরুপ, অপরাধীরা ধরা পড়লেও মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার আদালত কে রাজনৈতিক ভাবে ব্যাবহার করছে সরকার। এখানেও গুরুত্ব পূর্ণ সমস্যা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

মুক্ত গণতন্ত্র চালু 

সরকার একরকম রাজতন্ত্র চালু করে ফেলেছে। যেখানে বাকস্বাধীনতা নেই। ফলে একশ্রেনী বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক কর্মীরা চরম পন্থায় জড়িয়ে যাচ্ছে। এ জন্য মুক্ত গণতন্ত্র চালু করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

পরিশেষে একটি কথা বলা জরুরী যে বাংলাদেশ ভয়ংকর পথে এগিয়া চলেছে । দেশটা আমাদের। রক্ষাও আমাদেরই করতে হবে। আশা করি রাজনৈতিক খেলা বন্ধ করে ,সবাই মিলে দ্রুত পদক্ষেপ নিবে।

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year