pic_ms_iacd7_16_en.jpg

পার্সেলনামা

User Rating:  / 0
PoorBest 

 

 

 

পার্সেলনামা


সপ্তাহ দুয়েক পূর্বে দিনাজপুর থেকে রাজশাহীতে একটি পার্সেল পাঠাতে হয়েছিলো। সুন্দর করে প্যাক করে নিয়ে গিয়েছি। ভাজ করে যথাসম্ভব ছোট করে প্যাক করা হয়েছিলো। পার্সেল পাঠানোর কথা বলতেই তারা জিজ্ঞেস করলো, "ভিতরে কি আছে?"
ভিতরে শার্ট আছে জানতে পেরে ১২০ টাকা চেয়ে বসলো। অবাক হওয়ার পালা, যে শার্ট ওটা দাম শ-পাঁচেকের বেশি হওয়ার কোন রকমের সুযোগ নেই, কিন্তু পার্সেল খরচ তার চার ভাগের এক ভাগ। আমি প্রথমে পাঠাতে রাজী হলাম না, সেখানকার কর্মকর্তা আমাকে একশত টাকা দিতে বলল। আমার তাও মনঃপুত ছিল না। কিন্তু যাকে পাঠাবো তার ঐ শার্ট টাই চাই এবং দ্রুত চাই। অগত্যা পার্সেল পাঠাতেই হল।


পাশেই আরেক ব্যক্তির সাথে পার্সেল কোম্পানির এক স্টাফের কথা কাটাকাটি হচ্ছিল। তিনিও পার্সেল পাঠাতে গিয়েছিলেন। খুব সুন্দর করে প্যাকিং করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ঐ ব্যক্তির কথায় জানতে পারলাম, তিনি ঢাকায় এগারোটি পাসপোর্ট পাঠাতে চান। কর্তৃপক্ষ জানতে চেয়েছিল ভিতরে কি আছে আর তিনি সত্যিটা বলে দিয়েছেন। এখন কর্তৃপক্ষ প্রথম পাসপোর্টের জন্য পঞ্চাশ টাকা এবং পরের দশটির জন্য চল্লিশ টাকা করে মোট চারশত পঞ্চাশ টাকা চেয়েছিল। ক্ষুব্ধ ব্যক্তির কথা হল এতো ছোট অল্প ভার যুক্ত ছোট প্যাকের জন্য এতো টাকা কেন দাবি করা হচ্ছে। এরপর তিনি কোমরে দড়ি বেঁধে রীতিমতো মাছের বাজারের মতো দরাদরি শুরু করে দিলেন, ঐ পক্ষও ছাড় দিতে নারাজ।
পার্সেল অফিসে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় আমি চলে আসি, পরের ঘটনা জানা নেই।


মাস দুয়েক আগে ঢাকায় একটা পার্সেল পাঠাতে হয়েছিলো, একটা সার্টিফিকেটের ফটোকপি। সেবার যথারীতি কর্তৃপক্ষ আমাকে জিজ্ঞেস করলো ভিতরে আছে কি?? আমি সত্যি বললাম। তারা সেটার জন্য আশি টাকা দাবি করে বসলো। আমি তাকে বললাম, এটা তো সামান্য একটা কাগজ, তাও ফটোকপি, কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। খুব গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বলে আমাকে বোঝাতে লাগলো। শেষমেশ ষাট টাকা বলল।
আমি বের হয়ে এলাম, সেদিন বিকেলে এক বন্ধুকে দিয়ে পাঠালাম, আর তাকে বলতে বললাম, "ভিতরে কি আছে সে জানে না", এই কথা যেন বলে।
এবার কাজ হল, এবার আর কোন ঝামেলা হল না, তারা ত্রিশ টাকায় সেটি ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিল।


কিছুদিন পূর্বে আরেকটি পার্সেল পাঠিয়েছি, এটা আরও দূরে। ভিতরে কিছু অরনামেন্ট জাতীয় জিনিস ছিল। যথারীতি প্যাক করে নিয়ে গিয়েছি। তারাও নিয়মমাফিক জিজ্ঞেস করলো, "ভিতরে কি আছে"। এইবার বললাম, ভিতরে কিছু চকলেট আর অল্প কিছু জিনিস আছে। ওরা প্যাকেট নিয়ে নিলো এবং ৮০ টাকা বিল করলো। আমি কিছু না বলে বেরিয়ে এলাম।


এতো পার্সেল পাঠানোর পর অবশেষে আমার নামেও একটি পার্সেল এলো। পার্সেল পাঠিয়ে জনৈক বড় ভাই আমাকে টেক্সট করে ব্যাপারটা জানিয়ে দিয়েছিলেন। সাধারনত ঢাকা থেকে পার্সেল পাঠালে পরের দিন দিনাজপুরে চলে আসে। পরের দিন আমার মোবাইলে একটি বাংলালিংক নাম্বার থেকে কল আসে, কিন্তু তখন আমি একটি কাজে ব্যস্ত থাকায় কলটি রিসিভ করতে পারিনি। পরে অবশ্য ৩-৪ বার কল করেছি, কিন্তু কেউ রিসিভ করেনি। এভাবে দুই দিন অতিবাহিত হল, আমি বড় ভাইকে নক দেই, সে জানায় সে ঐ দিনই পাঠিয়ে দিয়েছিল। এবার আমি গিয়ে ঐ অফিসে খোজ করলে তারা প্রশ্ন করে আমার নাম্বারে কোন কল এসেছে কিনা?? আমি নাম্বার জানতে চাইলে তারা সেই বাংলালিংক নাম্বারটা বলে। আমি জানাই যে একবার কল এসেছিলো এবং আমিও যে পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার সেই নাম্বারে ট্রাই করেছি। এর বিপরীতে সে জানায়, অনেক পার্সেল তাই এমন হয়েছে, শুনে মাথা গরম হয়ে গেলো। মনে হচ্ছিল কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেই কিন্তু লোকটি বয়োজ্যেষ্ঠ, তাই পার্সেল নিয়ে হনহন করে বের হয়ে এলাম। 


জন নিরাপত্তার কথা বলে কর্মকর্তারা ভিতরে কি আছে জানতে চান, কিন্তু এই সুযোগকে তারা টাকা নেওয়ার একটা অপকৌশল বানিয়ে নিয়েছেন তাদের স্বার্থে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সিসিটিভি ক্যামেরা নেই, না আছে পার্সেলের ভিতরে ক্ষতিকর কিছু আছে কিনা তা যাচাই করবার উপযুক্ত সরঞ্জাম। ফলে যদি কেউ বেশি টাকা দিয়ে সত্যি গোপন করে ক্ষতিকর কিছু পাঠাতে চায়, তবে তাও সম্ভব। কিংবা নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টায় বা অন্যদের সামগ্রীর ক্ষতি করতে চেয়ে সেখানে বিস্ফোরন করে সেটাও অসম্ভব কিছু না।


পার্সেল কোম্পানিগুলো সার্ভিস দেওয়ার ক্ষেত্রে যেহেতু রশিদ দিচ্ছে, তবে ধরেই নেওয়া যায় যে, এখান থেকে সরকার ভালো আয়ের উৎস। যা দেশের জন্য নিঃসন্দেহে ভালো। এটা লিস্ট টাকা নিচ্ছে কিন্তু রশিদ দিচ্ছে না এমন ব্যাপার ঘটে না।


সরকারের লাভ হলেও এটা কিন্তু জনগণের জন্য কোন স্বস্তির কথা না। পার্সেল কোম্পানিগুলো টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা করছে। এই আয়ের প্রায় সম্পূর্ণ অংশ মালিক পক্ষ নিচ্ছে কোন যুক্তি ছাড়াই, আর সরকার এখান থেকে সান্ত্বনা পুরষ্কারও পাচ্ছে কিনা সন্দেহ আছে আর জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে। জনগনকে জিম্মি করে মালিকপক্ষ সরকারকে মুলা দেখিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে।

১০
এগুলোর জন্য সরকারি কোন বিঁধিমালা আছে কি নেই তা আমার জানা নেই। থাকলে সেগুলোর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে জানা মতে "ভোক্তা অধিকার আইন" এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।

১১
কিছু সুপারিশঃ
ক) নির্দিষ্ট সাইজ, ওজন এবং দূরত্ব অনুযায়ী সরকারি মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া উচিৎ। এবং সেই নির্ধারিত মূল্য তালিকা কোন দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে দেওয়া দরকার,
খ) ভোক্তা অভিযোগ গ্রহণের সুব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে হটলাইন নাম্বার চালু করা যেতে পারে।
গ) এই কোম্পানিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে মনিটরিং সেল করা যেতে পারে।
ঘ) আগ্নি নির্বাপণ যন্ত্রসহ জননিরাপত্তা এবং মালামালের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনিয় সকল যন্ত্রপাতি রাখার জন্য কঠোর বিধান করা প্রয়োজন।
ঙ) ভোগান্তি রোধে ভোক্তা অধিকার আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর গনশুনানির ব্যবস্থা করা।
চ) পার্সেল অফিস কর্মীদের আরও প্রফেশনাল হওয়া দরকার। গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

 

 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year