pic_ms_iacd7_16_en.jpg

নারীর পথরোধে বার্’বি পুতুল ও ভেতরকার রাজনীতি

User Rating:  / 1
PoorBest 

কিছুবছর আগেও এদেশের মেয়ে শিশুদের খেলার প্রধান উপকরণ ছিল পুতুল। এখনো যে নেই তা বলা যাবে না তবে অনেকাংশেই কম। শিশুদের এই খেলার মধ্যে ছিল ছোট ছোট কাপড়ের পুতুল বিয়ে দেওয়া, রান্না করা, ছোট ছোট কুঁড়েঘর করে এক বন্ধুর পুতুলের সাথে আরেক বন্ধুর পুতুলের বিয়ে। এমনকি গ্রামের পরিবেশে বেড়ে ওঠা সফল নারীদের অনেকেরই এই খেলার সাথে সরাসরি পরিচয় আছে।

 

আর এর মধ্যে দিয়ে মেয়েরা তাদের নারী জীবনের ঘরদোর সামলানোর প্রথমিক পাঠ চুকিয়ে নিয়েছে। নারীদের কাজ হলো বিয়ে করা, সন্তান জন্মদান, রান্নাবান্না করা ও অন্যান্য মেয়েলি কাজ করা এই ধারণাটা  পুতল খেলার মধ্যে দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

আশার কথা হলো এখন পুতুল খেলার সেই চল তেমন বেশি নেই। এটা মোটেও নারী মুক্তির পক্ষে কথা বলে না। কারণ নারীদেরকে ‘মহিলা’ করে রাখার জন্য পুরুষ শাষিত সমাজ নুতন নতুন পন্থা হাজির করেছে। অনেকটা আধুনিক উপায়ে মানসিক পরিবর্তন ঘটিয়ে এই ভোগবাদ প্রথা চলছে। আর মেয়ে শিশুদের সেই পুরনো উপকরণ ‘পুতুল’ এই ভোগবাদ রাজনীতির প্রধান উপকরণ।

 

 বার্বি পুতুলের মধ্যে দিয়ে নারীদেরকে সৌন্দর্য, শরীর গঠন, পোশাক প্রভৃতির মধ্যে মজিয়ে রাখছে তাই তারা এর বাইরে যেয়ে নারী মুক্তির প্রকৃত চিন্তার মধ্যে ঢুকতে পারছে না। বরং এই পুতুল তাদের মধ্যে যে সুন্দর-অসুন্দরের ধারণা ঢুকিয়ে দিচ্ছে তা সমন্বিত মুক্তির জয়গানের পথে বাঁধা সৃষ্টি করছে।

 

কেবলমাত্র  এই বার্বি পুতুলের মধ্য দিয়ে হাজারো কোটি টাকার রূপচর্চা সামগ্রির ব্যবসা চলে পৃথিবীজুড়ে। এই বার্বি ঠিক করে দিচ্ছে নারীর চোখ গোল গোল হবে নাকি অন্য রকম, চুলের রং ব্রাউন কালার হবে নাকি সোনলি। তাকে নিয়মিত ডায়েট করতে হবে কারণ তার সৌন্দর্যের মূল্য অনেক। সে কিভাবে হাঁটবে, বসবে, কথা বলবে সবকিছু । ফলে নারীরা এই সমস্ত ব্যাপার নিয়ে মেতে থাকে। আর শিশুদের হাতে পুতুল তুলে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে এই ধারণা তাদের মধ্যে স্থায়ীরূপ লাভ করে।

 

ফলে সমাজের নারীদের মূল্যায়নের একটি বড় মাপকাটি হয়ে উঠছে তার সৌন্দর্যের আদল। আর তারা ঝাপিয়ে পড়ছে এই প্রতিযোগিতায়। বলিউড, হলিউডের হিরোইনদের মতো শরীর গঠনের চেষ্টা চলছে অনেকের মধ্যে। অনেকের মুটিয়ে যাওয়া নিয়ে কথা শুনতে হচ্ছে। আর তাই বারবি আসছে এর সমাধান দিতে এবং উচ্চতা অনুযায়ী একজন নারীর ওজন কত হবে তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে।

 

আর এই ওজনে হাজির হতে গেলে নারীদের সন্তান ধারণের প্রাকৃতিক প্রয়োজনে  যে পরিমাণ চর্বির প্রয়োজন তা শরীরে থাকছে না। ফলে তারা আবেদনময়ী হচ্ছে ঠিক কিন্তু সন্তান ধারণ করতে পারছে না। তাহলে এটা প্রমাণ করে যে পুরুষশাসিত সমাজ এটার মধ্যে দিয়ে ভোগবাদ তথা যৌনবাদি ধারণাকে সম্প্রসরিত করছে। আর চর্বি কমানোর কারণে নারীরা অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া ও অন্যান্য না খাওয়া জনিত রোগে ভুগছে।

 

তাই নারী মুক্তির জন্য নিঃসন্দেহে পুরুষতন্ত্র, ভোগবাদ ও পুঁজিবাদের সাথে লড়তে হবে। একই সাথে নারীদের নিজেদের লড়তে হবে নিজেদের অস্তিতের সাথে। নিজেরা নিজেদের মধ্যে যে বৈষম্য তৈরি করছে তার বিরুদ্ধে নারীদেরকেই দাঁড়াতে হবে। নারীর মুক্তির জন্য শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতাবোধ সম্পূর্ণো হতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ নিতে হবে সমন্নিতভাবে। রূপচর্চার অভিজাত্যের মধ্যে হারিয়ে গেলে এ পথ পাড়ি দেওয়া বেশ কঠিন।

 

কারণ প্রকারান্তে এই বার্বি ধারণা তথা সুন্দর-অসুন্দরের ধারণা প্রকট হওয়ার কারণে যৌতুক, নারী নির্যাতন, তালাক, বহুবিবাহসহ নারীদের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সামজিক সমস্যা ভয়াহব আকার ধারণ করেছে। তাই নারী মুক্তির জন্য সমস্যা নির্ধারণ করতে হবে এবং কেবল নারী-পুরুষের মধ্যকার নয় সাথে নারীদের সাথে নারীদের যে বিভাজন সমাজে সৃষ্টি হয়েছে তারও সমাধান বের করতে হবে।

 

(তথ্য সুত্র : পুতুলেখেলার রাজনীতি। বারবি কাহিনি; নাসরিন খন্দকার; শিক্ষক: নৃবিজ্ঞান বিভাগ; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় )

 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year