pic_ms_iacd7_16_en.jpg

কাদম্বরী'র রবি

User Rating:  / 1
PoorBest 

কাদম্বরী'র রবি

 

গত সপ্তাহে রবীন্দ্রনাথের প্রিয়তমা বৌঠান ‘কাদম্বরী দেবী'কে নিয়ে লেখা একটি উপন্যাস পড়েছি। নাম ছিল ‘কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট', লিখেছেন রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়। উপন্যাসটি স্মৃতিচারনধর্মী এবং বর্নণাত্বক রীতিতে (Narrative form) লেখা। এটি নিছক একটি উপন্যাস নয়; কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির একটি প্রামাণ্য দলিল যেখানে উল্লেখ রয়েছে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চাপিয়ে দেয়া অলিখিত সংবিধান যেটিকে অমান্য করার দুঃসাহস স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ করেননি। 

 

আদতে এটি একটি কাল্পনিক সুইসাইড নোট যেটি কাদম্বরী দেবী আত্নহত্যার পূর্বে লিখেছেন বলে কথিত আছে; এর সাহিত্য রূপ দিয়েছেন রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়। এখানে একটি বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা উচিত, তা হল, সত্যিই কি কাদম্বরী আত্নহত্যা করেছিলেন নাকি ঠাকুর বাড়ির নাম ও যশ'এ ঈর্শান্বিত হয়ে কেউ এ ধরনের অপপ্রচার চালিয়েছিলেন? আর যদি তা না হয় তাহলে কেন তার মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি করে দেবেন্দ্র ঠাকুর নিজ বাড়িতে অতি গোপনে বসিয়ে ছিলেন ‘করোনার কোর্ট', কেনইবা কাদম্বরীর স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিত ছিলেননা নিজ স্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়? কিসের জন্যে ২৫ বছরের কাদম্বরী আফিম খেয়ে চিরতরে ছেড়ে গেলেন প্রানের সখা, রবিকে? 

 

লেখক রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় তার বিস্তর গবেষনা লব্ধ ঙ্গান দিয়ে সুনিপুন আঙ্গিকে একেঁছেন ঠাকুর বাড়ির অবিদিত ইতিহাস। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে ঠাকুর বাড়ির বাজার-সরকার (যিনি প্রত্যাহিক বাজার করেন) শ্যাম গাঙ্গুলির মা-মরা মেয়ে কাদম্বরী, ঠাকুর বাড়ির বউ হলেন এবং একই সাথে তিনি এও দেখিয়েছেন, কেন শ্যাম গা্ঙ্গুলি কখনই এ বাড়ি থেকে আত্বীয়ের সম্মান পাননি। 

 

এটি সহজেই অনুমেয়, শ্বশুর বাড়িতে কাদম্বরী ভালো ছিলেননা। ঠাকুর বাড়ির অন্যান্য বৌদের মত তার তথাকথিত রূপ ছিলনা। তাই প্রতি পদে পদে তাকে সহ্য করতে হয়েছে লাঞ্চনা-গঞ্জনা। এমনকি স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে স্ত্রীর প্রত্যাশিত মর্যাদাটুকু পাননি। জ্যোতিরিন্দ্রের দিনের বেশীর ভাগ সময় অতিবাহিত হত ‘জলসা ঘরে'। অপ্রত্যাশিতরকম সত্য হল এটাই, আধুনিকতাবোধহীন কাদম্বরী যেন চোখরে শূল ছিলেন ঠাকুর বাড়ির সবচেয়ে আধুনিকতাবোধ-সম্পন্ন নারী, ঙ্গানদানন্দিনী দেবীর (সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী)। আর, নিঃসন্তান হবার দরুন তার নিদারুন কষ্ট চাপা পড়েছিল ঠাকুর বাড়ির অন্দরমহলের নিয়ন্ত্রনে থাকা নারীকূলের নির্মানবিক আচরনে। ঠিক সেই সময়ই আলোর দ্যূতি হয়ে দেখা দিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হলেন তার প্রানের রবি। 

 

রবি ও কাদম্বরী দুজন মিলে করলেন ফুলের বাগান, নাম দিলেন ‘নন্দনকানন'। একে ঘিরেই

দুজনের প্রনয়ের সূত্রপাত। বয়সের দুরত্ব সত্ত্বেও দুজন ভীষন রকম সমান্তরাল ছিলেন বোধের জায়গাটিতে। একসাথে নাটকে অভিনয় করা ও সাহিত্যালোচনা তাদের আরো ঘনিষ্ট করেছিল; মানসিকভাবে। একথা অনস্বীকর্য, জ্যোতিরিন্দ্রের তাচ্ছিল্যই কাদম্বরীর রবীন্দ্র-প্রীতির পথ সুগম করেছিল, অন্তত এই উপন্যাস এ কথাই প্রমান করে। 

 

সত্যিকার অর্থে কাদম্বরী ছিলেন অন্তর্মূখী স্বভাবের ভীষন গুনী এক সত্ত্বা। যিনি যথাযথ যত্নের অভাবে প্রস্ফুটিত করতে পারেননি তার 'অদেখা ভূবন'। তার সুরেলা কন্ঠ আকৃষ্ট করত

সংগীতমোদী এমন যে কাউ কে; তার অভিনয় শৈলীও ছিল প্রণিধানযোগ্য। জ্যোতিরিন্দ্র রচিত ‘অলীক বাবু' নাটকে ‘হেমাঙ্গীনি' চরিত্রে কাদম্বরীর সপ্রতিভ উপস্থিতি, ঠাকুর বাড়ির সবার বিমুগ্ধ হবার কারন ছিল সেই সময়ে (এই নাটকের মূখ্য চরিত্র ‘অলীক বাবু' চরিত্রে অভিনয় করেন খোদ রবীন্দ্রনাথ)। 

 

রবি-কাদম্বরীর রসায়ন বাংলা সাহিত্য-সমাজের বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে। তাই এটি এড়াবার জো নেই যে, তাদের দুজনের মাঝে কোন সম্পর্ক ছিলনা। তা না হলে, বিলেত যাত্রাপথ থেকে হটাৎ আকূল হয়ে কাদম্বরীকে দেখার উদ্দেশ্যে বাড়ি ফিরতেন না রবি অথবা তাকে ডাকতেন না “সরোবরময়ী” বলে। ঠিক একই কথা কাদম্বরীর জন্যেও প্রযোজ্য। এই উপন্যাসের এক জায়গায় কাদম্বরী রবি ঠাকুরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, 

“তোমার কাছে আমি একটি, বৃষ্টিভেজা ফুলের বাগান।“ 

 

এছাড়া, আরো একজন ব্যক্তি কাদম্বরীকে দূর্নিবার আকর্ষনে নিভৃতে ভালোবেসে গেছেন। তিনি বিশুদ্ধ কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী। জ্যোতিরিন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় ঠাকুর বাড়িতে অবাধ যাতায়েত ছিল তার। কাদম্বরী ছিলেন তার কবিতার একজন বিমুগ্ধ শ্রোতা। বিহরীলালের আরেকটি পরিচয় হল, তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিককার রচিত কবিতার একজন নিবিষ্ট পাঠক পাশাপাশি সচেতন সমালোচকও ছিলেন। 

 

যেহেতু কাদম্বরী ষড় রিপু নিয়ে জন্মানো একজন সাধারন মানুষ তাই তার ভেতর ভালো-মন্দ দুটি সত্ত্বাই বর্তমান। অনেকে তাকে লঘু চরিত্রের নারী বলেও অবহিত করেন। তাই শুধু ঠাকুর বাড়ির বউ নয়, তাকে একজন মানুষ হিসেবে দেখা বিশেষভাবে কাম্য। 

 

সবশেষে, ধন্যবাদ লেখক রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়কে, 'কাদম্বরী দেবী'র মত এতো সুগভীর এবং পরিব্যাপ্ত বিষয়কে ক্ষুদ্র কলেবরে উপন্যাসের আঙ্গিকে তুলে ধরে সাধারন পাঠকের জানার পরিধি বাড়াবার জন্যে।

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year