pic_ms_iacd7_16_en.jpg

কতটুকু দায়িত্ব পালন করছি মানুষ হিসাবে, নিজের কাছে প্রশ্ন।

User Rating:  / 3
PoorBest 

নিজের গায়ে হলুদের জন্য বসবো এমন সময় জুনিয়র এক ছেলের ফোন। কি ব্যাপার জানতে চাইলে, জানালো একটি মেয়ের বিয়ে, মেয়েটিকে আমি চিনি। আমার ছাত্রী, এসএসসি পাস করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হবে। কিন্তু ভর্তির আগেই বিয়ে। মেয়েটি যথেষ্ট মেধাবী। বললাম, আমি এখন নানা বাড়ী গায়ে হলুদের জন্য এসেছি, সব আয়োজন শেষ। এর মধ্যে বোনের চিৎকার, তোমার সব সময় ব্যস্ততা, নিজের বিয়ের সময়ও বাল্য বিয়ে আটকাতে হবে! তাড়াতাড়ি আসো, সবাই বসা। আমাকে যেতে হবে, না যাওয়াটা অভদ্রতা, কিন্তু বাল্য বিবাহ বন্ধ করাটা নাগরিক হিসাবে আমার দায়িত্ব।
ঐ ছেলেকে স্থানীয় চেয়ারম্যানের ফোন নম্বর দিলাম, কিন্তু বন্ধ। ইউএনও‘কে জানাতে বললাম। তিনি বললেন, চেয়ারম্যানকে জানান, ফোন বন্ধ বলতেই বললেন ওসিকে জানাতে। আমাকে ছেলেটি সমানে ফোন করে চলেছে, আর আমি ভিজে অবস্থায় বিভিন্ন জনের ফোন নম্বর দিয়ে চলেছি। আর ও ফোন করছে আর একটু পর পর আপডেট দিচ্ছে। এর মাঝখানে আমার মাথায় প্রশ্ন আসলো, ঐ ছেলেটি এতো চিন্তিত কেন? ভাবলাম, সেটা পরে দেখবো। এবার নিজেই ফোন দিলাম প্রেস ক্লাবের সভাপতিকে, তিনি দেখছি বলে আশ্বস্থ করলেন। ফোন দিলাম মহিলা পরিষদের সভানেত্রীকে, বললেন আমি এখন দায়িত্বে নেই। ফোন করলাম, নতুন সভানেত্রীকে। জানালেন, বিভিন্ন সমস্যার কথা, এ্যাকশনে যেতে পারবেন না, দুঃখ প্রকাশ করলেন যে, আমি ফোন করার পরও কিছু করতে পারছেন না। ওসিকে ফোন করার পরামর্শ দিলেন।
যখন থেকে বুঝি, তখন থেকে পুলিশ এড়িয়ে চলি। তাই ওসিকে ফোন না দিয়ে চেয়ারম্যানকে আবার চেষ্টা করতেই ফোন ঢুকলো। বললাম সব কিছু, তার উত্তর ‘নির্বাচনের পনের দিনও বাকি নেই। আমাকে এর মধ্যে না ডাকা ভাল, তুমি তোমার মতো করে ব্যাপারটা দেখ’। আমি ইউএনও’কে ফোন দিতেই বললো, আমি দেখছি, আশা করি বন্ধ হয়ে যাবে। সন্ধ্যায় চেয়ারম্যান ফোনে বললো, বিয়ে বন্ধ হইছে? আমি বললাম, জানি না। তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি বন্ধ করাও, আমি তো এই মুহুর্তে ফেস হতে পারছি না, তুমি-ই দায়িত্ব নিয়ে করো। যাই ই হোক, আগেই বন্ধ হয়েছিল বিয়েটা। পরে জানতে পারলাম, ঐ ছেলেটির সাথে মেয়েটির একটি সম্পর্ক আছে, তাই এতো উৎকন্ঠা। আমি অবাক, ১৬/১৭ বছরের ছেলে মেয়েরা এ কোন দিকে যাচ্ছে! সময় পেলেই ভাবি, পরবর্তী প্রজন্ম কেমন হবে? আধুনিকতার নামে আমার সন্তান বখাটেদের দলভূক্ত হবে না তো! আকাশ সংস্কৃতির খারাপ দিক, এদের বিপথে নিচ্ছে না তো?
কয়েক দিন পর বিয়ে কিন্তু ঠিকই হয়ে গেল। গোপনে কোথায় নিয়ে রেজিষ্ট্রি বিয়ে করাতে পারে নি, তাই কোন এক হুজুর বিয়ে পড়িয়ে দিয়েছে, পরে রেজিষ্ট্রি হবে। বাবা-মা’দের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। প্রশাসন নিষেধ করছে, রেজিষ্ট্রি কাজী বিয়ে পড়াচ্ছে না, তারপরও বিয়ে দিতেই হবে, কেননা পাত্র চাকুরী করে। কোথায়? কোন এক কারখানায়! কি অদ্ভুদ সব যুক্তি এই সকল অভিবাবকের।
সেই বিয়ের পাঁচ মাসও হয়নি, আমি গেছি এক নেতার কাছে, তিনি ডাক্তারও। আমার উদ্দেশ্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া। পাত্র পক্ষ নালিশ নিয়ে এসেছে, মেয়ে স্বামীর কাছে যেতে চায় না। ও ঐ সংসার করবে না। আমি মাঝখানে বাঁধা দিয়ে বলি, ঐ বিয়েটাতো? ডাক্তার সাহেব সায় দিলেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, বিয়ে তো বন্ধ করা হলো। তারপরও আপনার ছেলে কেন বিয়ে করলো? আর মেয়ে ছিলো না দুনিয়ায়।  অভিবাবকের মুখে কথা নেই। ডাক্তার সাহেব রাগন্বিত স্বরে বললেন, বিয়ে বন্ধে আমি আপনাদের বুঝালাম, মেয়ের বাবাকে বুঝলাম, আপনারা শুনলেন না। এখন কেন আসলেন?
আমার ব্যস্ততা ছিলো, চলে আসলাম পরামর্শ নিয়ে। হাঁটছি আর ভাবছি, ক্ষণিকের একটি ভুল সিদ্ধান্ত কেমন করে দু’টির অধিক জীবন নষ্ট করতে পারে। বাড়ির পাশের এক মেয়েকে ইচ্ছার অমতে বিয়ে দেওয়ার দশ দিনের মাথায় তালাক হলো, অন্য এক মেয়েকে কোন খোঁজ খবর না নিয়ে বিয়ে দেওয়াতে এক সপ্তাহও সংসার টিকলো না। অভিবাবক শুধু ছেলের আয়, চেহারা আর বাহ্যিক সুখ দেখে বিয়ে দিতে ব্যস্ত। মেয়ের বয়স, ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন মূল্য না দেওয়াতে ঘটছে এতো সব অঘটন।
আসুন মেয়েটিকে মানুষ মনে করে - তাঁর আইনগত অধিকার, মানুষ হিসাবে প্রাপ্য অধিকার, সামাজিক অধিকারের সবটুকু ভোগ করার মতো সুযোগ সৃষ্টি করি। এক পা নিয়ে বেশি দূর চলা যায় না, মুখ থুবড়ে পড়েতে হয় – এটা আপনাকে মানতে হবে।

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year