pic_ms_iacd7_16_en.jpg

'যোগাযোগ' এবং রবীন্দ্র-রাজ্য ভ্রমন

User Rating:  / 4
PoorBest 

                        'যোগাযোগ' এবং রবীন্দ্র-রাজ্য ভ্রমন 

 

     কেউ কেউ মন্তব্য করেন, "রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সকল সৃষ্টির মাঝে দুর্বলতম দিক, তার উপন্যাস।" অর্থাৎ রবি বাবুর উপন্যাসগুলো তার কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, গান, প্রবন্ধ এবং চিত্রকলার তুলনায় সবথেকে অপরিপক্ক। এটা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের আবেগসর্বস্ব, অপ্রজ্ঞাসুলভ, সাম্প্রদায়িক মনের কথা। রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রভাত কুমার মূখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ওপার বাংলার শঙ্খ ঘোষ, যোমনীকান্ত সোম এবং এপারের আনিসুজ্জামান, আহমদ মাওলার মত রবীন্দ্র-গবেষকগন দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেন, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস তার অপরাপর সৃজন-সৃষ্টির চেয়ে কোন আঙ্গিকেই পিছিয়ে নেই। 

 

   ওপরের আলোচনাটির প্রাসঙ্গিকতা আলোচ্য প্রবন্ধের বিষয়বস্তুুকে সমর্থন করবে, তাই শুরুতেই রবীন্দ্র-উপন্যাসের পক্ষ নিয়ে এই সাফাই। 

 

     গুরুত্ব ও মূল বিষয়ের আলোকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'যোগাযোগ' উপন্যাসটি নিঃসন্দেহে উচ্চমার্গীয়। এটি আমার একার কথা নয়, রবীন্দ্র-প্রভাব মুক্ত ও যুক্ত সকল সাহিত্য বুভুক্ষ মানুষ এতে একমত। এর আগে আমার পড়া দুটি উপন্যাসের (চতুরঙ্গ এবং নৌকাডুবি) বিচারে 'যোগাযোগ' অনেক বেশী হৃদয়গ্রাহী, সামাজিক এবং মানবীয়। আরো সহজ করে বললে, এটায় একটা বিশেষরকম ভারীক্কি আছে যা বোধগম্য হবে এই গল্পের অবয়ব নির্মান-কাঠামোর ওপর সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে। রবি বাবু তার প্রখর সমাজসচেতন মন এবং নির্মোহ মানবীয় সম্পর্কের রসায়ন জ্ঞান দ্বারা উন্মমোচন করেছেন এমন এক গল্প যা দুটি পরিবারের গল্প বলতে গিয়ে বলেছে সমগ্র সমস্যা সংকুল মানবজাতির কথা। 

 

   চাটুজ্যে এবং ঘোষাল পরিবার দুটির মানসিক অবস্থান দুই মেরুতে। বসতি তাদের একই এলাকায় কিন্তু চিন্তা, স্বভাব, আচরন, কাজ ইত্যাকার বিষয়গুলোর ধরন আকাশ-পাতাল ব্যবধান। একবার পূজোয় কে কার চেয়ে উচুঁ প্রতিমা বানাবে তা নিয়ে রক্তারক্তি এবং শেষমেশ ঘোষালদের এলাকা ত্যাগ। এভাবে গল্পকার রবি ঠাকুর 'যোগাযোগ' উপন্যাসের যাত্রা আহ্বান করেন। 

 

     এর পরের অংশে দেখা যায় খাজনা ও ঋণে জর্জড়িত চাটুজ্যে পরিবারের বড় ছেলে বীপ্রদাস কি পরিমান চিন্তিত নিজ পারিবারিক সম্ভ্রম এবং প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত ছোটবোন কুমুকে নিয়ে। চাটুজ্যেদের এই অসহায়ত্বের সুযোগের সদ্ব ব্যবহার করে এতো দিনে নিজেদের অবস্থাসম্পন্ন করা ঘোষল পরিবার। এই পরিবারের মেঝছেলে মধুসূদন ঘোষাল বিয়ের প্রস্তাব করেন চাটুজ্যে বাড়ির কন্যা কুমুকে। একসময় কুমুর সম্মতিতেই তার বিয়ে হয় মাঝবয়সি মধুসূদন ঘোষালের সাথে। 

 

   লেখক রবীন্দ্রনাথ এখানে দেখিয়েছেন, বিয়ের পর একজন নারীকে কিভাবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে শ্বশুড় বাড়িতে অবস্থান করে নিতে হয়। এই উপন্যাসের কুমু চরিত্রটি তৎকালীন নারী সমাজের কথা বললেও এটি এখন আব্দি হয়ে আছে বাংলার নারীর ঐতিহাসিক প্রামান্য দলিল। অবশেষে, কুমুর চারিত্রিক দৃড়তা এবং ধৈর্যের কাছে পরাস্থ হন তার স্বামী মধুসূদন। উপন্যাসের সমাপ্তি মিলনের মধ্যদিয়ে হলেও রেখে গেছে হাজারো চিন্তার খোরাক। 

 

     আলোচ্য উপন্যাসের একটি প্রনিধানযোগ্য চরিত্র, শ্যামা বৌদি। মধুসূদনের বড় ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী তিনি। মধুসূদনের কুমুর সাথে বিয়ে পরও কিছু সময় তিনি ঘোষাল বাড়িতে অবস্থান করেছে এবং পরে চলে যান তার স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতে। শ্যামা বৌদির বাড়ি ত্যাগের মূল কারণ মধুসূদনের তার প্রতি অনাগ্রহ। একসময় দুজন ভীষন রকম ব্যাভিচারে লিপ্ত ছিলেন কিন্তু বিয়ের পর সেটি ঐ বাড়িতে আর সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। শ্যামা চরিত্রের মধ্য দিয়েও রবি ঠাকুর অবতারনা করেছেন চিরন্তন বাঙ্গালি বিধবা নারীর জীবনালেখ্য। যা এখন গতিহীনভাবে বহমান রয়েছে আমাদের সমাজে। এই উপন্যাসের একটি আপাত রসিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ন চরিত্র মধুসূদন ঘোষালের ছোটভাই নবীন এবং তার স্ত্রী। ভাইয়ের ভয়ে সদা তটস্থ থাকলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সদা তৎপর তিনি। 

 

   মূলত 'যোগাযোগ' উপন্যাসের মাধ্যমে রবি ঠাকুর প্রেম ও বাস্তবতার এক চমৎকার রসায়ন ঘটিয়েছেন। প্রেমকে তিনি দিয়েছেন এক নতুন রূপ এবং বাস্তবতা চিত্রনে ছিলেন বেহিসাবি, তাই এই উপন্যাস হয়েছে ধ্রুপদী গোত্রের অনুগামী।

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year