pic_ms_iacd7_16_en.jpg

মানবী'র চোখে রবীন্দ্রনাথ

User Rating:  / 5
PoorBest 

“আমাদের এই আলোচনায় এ পর্যন্ত যারাই এসেছেন, সবাই স্বার্থপর হয়ে ভাগ করে নিয়েছেন নিজ নিজ রবীন্দ্রনাথ, আর এরই মধ্য দিয়ে আমরা আবিষ্কার করেছি নতুন নতুন রবীন্দ্রনাথকে,” এমনই সুগঠিত-ব্যঞ্জনাময় কথামালায় রবীন্দ্র-বিষয়ক আলোচনা অনুষ্ঠান ‘আমার রবীন্দ্রনাথ'-এর গোড়াপত্তন করেছেন এর উপস্থাপক-সাহিত্যিক রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়। রঞ্জন নিজেও একজন উচুঁ দরের রবীন্দ্র গবেষক। এই আলোচনা অনুষ্ঠানের দুটি পর্ব গতরাতে ইউটিউবে দেখেছি। দুই পর্বে দুজন নিমন্ত্রিত অতিথি, যথাক্রমে, অপর্না সেন এবং ঋতুপর্ণ ঘোষ। দুজনই আপদমস্তক সিনেমার মানুষ। যদিও ঋতুপর্ণ আজ অমর্ত্যলোকবাসী, তাই প্রারম্ভেই তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। 

রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে দুজন বিদগ্ধ-সৃজনশীল চ্চলচিত্র নির্মাতা দেখছেন, তারই অকাট্য দলিল এই আলোচনা অনুষ্ঠান। আমি বিশুদ্ধ প্রয়াসে সেই আলোচনার আলোকে আমার দৃষ্টকোনে আপাত গুরুত্ববহন এবং প্রনিধাণযোগ্য বিষয়গুলোকে একটি নাতিদীর্ঘ শাব্দিকরূপ দিচ্ছিমাত্র। 

প্রথম পর্বের আলোচক অপর্না সেন জানালেন যে, খু্ব ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথকে নিজ পরিবারের একজন ভেবে বেড়ে উঠেছেন তিনি। রবীন্দ্র-রচনাবলী ছিল তাদের বাড়ির একটি অবিচ্ছেদ অংশ বা খানিক বাড়িয়ে বললে, তাদের পরিবারের ফুসফুস। অপর্নার মতে, আধুনিক বাঙ্গালী জাতি বিনির্মানে যে দুজন মানুষ অপরিহার্য ছিলেন, তারা হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সত্যজিৎ রায়। তার এই দাবিকে আবেগীয় বিবৃতি ভাবার জোঁ নেই কারন সাহিত্য এবং চ্চলচিত্র দিয়ে এদুজন মানুষ যেভাবে বিশ্ব-দরবারে বাঙ্গালীর উপস্থিতি সরব করেছেন তা আজও অবিকৃতরূপে স্বীকৃত। 

কবি-মনের কল্পনা ছিল রবীন্দ্রনাথের সহজাত শক্তি তাই বলে বাস্তবতাকে তিনি কখনো পর করে রাখেন নি বরং তার সৃজন-সৃষ্টির প্রতিটি কোণে কোণে সেঁটে দিয়েছেন বাস্তবতার বিরূপতম অনুসঙ্গ। অপর্না সেনের ভাষায়, "কোন একটা জায়গায় সব মানুষই একা এবং সেই একাকিত্বের জায়গাটি ছুঁতে আমার খুব ভালো লাগে। শিল্প সৃষ্টির জন্য একাকিত্বের প্রয়োজন যা রবীন্দ্রনাথ আমায় শিখিয়েছেন।" 

রবীন্দ্রনাথ ধর্মে কতটুকু বিশ্বাসী ছিলেন, তা নিয়ে করা রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের প্রশ্নের উত্তরে অপর্না সেন বলেন, "তিনি ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী।" তিনি আরো বলেন, "কিন্তু তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন ধর্মাশ্রিতদের। যারা ধর্মকে তাদের জাগতিক স্বার্থ চরিতার্থের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন।" রবীন্দ্রনাথ সমন্ধে এমন তথ্যনির্ভর বাক্যালাপ সন্দেহাতীতভাবে গুরুত্ববাহী। 

"আমার রবীন্দ্রনাথ" আলোচনা অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের আলোচনার পুরোটা সময় রবীন্দ্র-কীর্তন করেছেন প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষ। আলোচনার সূত্রপাত করেন রবীন্দ্র-সঙ্গীত, 

"যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাঁকে, 

তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে, 

তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে"-এর মধ্য দিয়ে। 

"রবীন্দ্রনাথ কি দার্শনিক ছিলেন?", এমন প্রশ্নের অকপট জবাবে ঋতুপর্ণ এমনটি বলেন, "নিজ ব্যক্তি স্বার্থ অসীমের মাঝে মিলিয়ে দেয়া- উপনিষদের একটি উল্লেখযোগ্য দর্শন যা রবীন্দ্রনাথের মাঝেও ক্রিয়াশীল ছিল। ব্যক্তিগত ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ লালন-দর্শনের প্রতিও ছিল তার অগাধ বিশ্বাস।" 

ঋতুপর্ণের ছেলেবেলার স্মৃতিচারনের মধ্যদিয়ে উঠে আসে মহাভারতের কথা। যেহেতু মহাভারত একটি শ্রুতি-বিদ্যা তাই ঋতুপর্নের বাবা তাকে সেটা পড়ে শোনাতেন যেমনটি চলতো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেও।  রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের একটি প্রশ্নে ভীষন বিব্রত হন ঋতুপর্ণ। যখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, "রবি বাবুর সাথে কেমন সম্পর্ক তোমার, ঋতু?" ঋতুপর্ণের চটজলদি জবাব, "আমার সাথে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক শুধু শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নয় বরং তাকে প্রচন্ড রকম জাপটে ধরে থেকে ভালেবাসা আদায়ের।" 

ঋতুপর্ণ অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে উপস্থাপককে স্মরণ করিয়ে দেন, তিনি, রবীন্দরনাথরচিত দুইটি উপন্যাস (চোখের বালি এবং নৌকাডুবি) অবলম্বন করে চ্চলচিত্র নির্মান করেছেন এবং এও জানান, রবীন্দ্রনাথের আত্নজীবনী ‘জীবন স্মৃতি’ নিয়ে তিনি আরেকটি সিনেমা করবেন। 

যখন উপস্থাপক প্রশ্ন করেন, কিভাবে তিনি হতাশার মাঝে আশা খোঁজেন, তার উত্তরে ঋতুপর্ণ রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস (উপন্যাসটির নাম এই মুহূর্তে স্মরণ করতে পারছিনা) থেকে একটি লাইন পাঠ করেন, 

"আমি আগুনের মধ্য দিয়ে হেটে এসেছি, যেটুকু পোড়ার ছিল পুড়ে ছাই হয়েছে, যেটুকু রয়েছে তার আর মরণ নেই।" 

ঋতুপর্ণ ঘোষ বিশ্বাস করতেন রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যুগপৎ নারী ও পুরুষ সত্বা বিরাজ করত। তার এই কথাকে সমর্থন করতে গিয়ে বলেন, "তা না হলে কি করে তিনি নারী-মনের গহীনে সুপ্ত আকুতি তার লেখায় উপস্থিত করতেন!" 

জীবনের মন্থর দিনগুলোতেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঋতুর সহযাত্রী। মানুষের জীবনে যাত্রাটাই বড়, গন্তব্য নয়- এ হল রবীন্দ্র-অমিয় বানী, যা নিজ কাধেঁ বয়ে নিয়ে চলতেন ঋতুপর্ণ। শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে বলতে গিয়ে ঋতুপর্ণ বলেন, " একটি শিশু যখন দিনের আলোয় Twinkle twinkle, little star পড়েন, তখন সুনিশ্চতভাবে তার ভেতর রাতের তাঁরার মোহময় স্নিগ্ধতা প্রকাশক্ষম হয় না।" যেকোন সংবেদনশীল মানুষও এ ব্যাপারে সহমত হবেন বলে আমার বিশ্বাস। 

অনুষ্ঠানের শেষাংশে কিছুটা বেদনাতুর কন্ঠে ঋতুপর্ণ কিছু মানুষের রবীন্দ্র-বোধ নিয়ে প্রশ্নতোলেন। একবার বিশিষ্ট ভারতীয় অভিনেত্রী শাবানা আজমি তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “Ritu, do you think, he is really that great as much as you people made him to be?” 

অনিচ্ছা সত্বেও লেখাটি এখানেই থামাতে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক নানা তথ্যে উপাত্তে ঠাসা এই আলোচনা। যেমন, রবীন্দ্রনাথের বড়চুলের জন্য স্কুলে তার কিছু সহপাঠী তাকে ‘বাইজী' সম্বোধন করতো। 

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যারা রবীন্দ্রপক্ষ বা সমালোচনার খাতিরে হলেও রবীন্দ্র চর্চা করেন, উভয়ের জন্য এই অনুষ্ঠানটি দর্শন বিশেষভাবে প্রযোজ্য। 

সবাইকে রাবীন্দ্রিক শুভেচ্ছা।

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year