pic_ms_iacd7_16_en.jpg

স্বাধীন তরুণীদের যেমন দেখেছি

User Rating:  / 7
PoorBest 

তাইওয়ানের ক্যাম্প সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ব্লগ লিখাবো, কিন্তু বাংলাদেশ ছাড়া শুধুমাত্র তাইওয়ান ভ্রমণ করায় বারবার তাইওয়ানের কথা চলে আসে।
ক্যাম্পের কয়েক দিন দেখেছি সে দেশের নারীর স্বাধীনতা। ২৪ জনের ক্যাম্পে ৪ জন ছিলো পুরুষ, বাকী সবাই নারী। চারজনের একজন কোরিয়ার, দুইজন তাইওয়ানের আর আমি বাংলাদেশের। যাবতীয় লিডিং পয়েন্টে নারী জয়জয়কার। ক্যাম্প লিডার একজন নারী, চকো চ্যান। সদা হাস্যজ্জোল চেহারা আর সাহায্যকারী মনোভাব। বাইরের থেকে যাবতীয় জিনিস আনার দায়িত্বে ফিনা, তার যেমন সুন্দর হাসি, তেমনি দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করা। রিহার্সেলে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রমী মেয়েটি এমা। কাজের বিষয়ে দারুন দায়িত্বশীল আর মজার একটি মেয়ে। যে আমাকে চপষ্টিকের ব্যবহার শিখিয়েছিলো। ড্রোসী, যে আমার দোভাষীর কাজ করতো। চায়না থেকে ইংরেজী অথবা ইংরেজী থেকে চায়না। মায়া মায়া চেহারার ঐ মেয়েটি না থাকলে আমার ক্যাম্পের কয়েক দিন বেশ বেগ পেতে হতো। ৮/১০ দিন এই মেয়েগুলো বাড়ির বাইরে, কিন্তু তেমন ফোন আসতে দেখলাম না। অভিভাবকদের আস্থা ছিল, তাদের মেয়ে ভালো আছে, নিরাপদে আছে। পক্ষান্তরে, পরিচিত এক মেয়ে আমাদের প্রোগ্রামে গিয়েছিল, সন্ধ্যার আগেই তার মায়ের ফোন, আমাকে খুব উদ্বিগ্ন কন্ঠে তার মেয়ের খবর জিজ্ঞাসা করলো। তাকে আশ্বস্থ করে বলেছিলাম, আমি ওর নিরাপত্তার ব্যাপার দেখছি। সে লাইন কেটে দিয়েছিলেন ঠিকই, জানি না কতটুকু আস্থা পেয়েছিলেন। এর কারণ, ঐ অভিভাবক তার সন্তানকে বাইরে নিরাপদ মনে করছেন না। ন্যাশনাল কনভেনশনে অনেক নারী ইয়েস সদস্য অভিভাবকের অনুমতি পান না বলে যোগ দিতে পারেন না। অভিভাবক অনুমতি না দেওয়ার কারণ নিরাপত্তা বোধের অভাব।

ক্যাম্প থেকে ফেরার পথে আমার লাগেজটা বেশ ভারী হয়ে যায়। কেননা কিছু জিনিস কিনেছিলাম জর্জকে সাথে নিয়ে। তুলতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল দেখে ড্রোসী বললো, আমি কি তোমাকে সাহায্য করবো। আমি হাসি মুখে উত্তর দিয়েছিলাম, না, ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের নারীদের আমরা মন থেকে এত বেশি দুর্বল করে ফেলেছি যে, অন্যকে সাহায্য তো দূরে থাক, নিজের সাহায্য করতেও মাঝে মাঝে আস্থা পান না। এটা তার না সামাজিক প্রেক্ষাপটের সংকীর্ণতা।
তাইওয়ানের শেষ রাত। একত্রে ডিনারের আয়োজন করা ছিল। সন্ধ্যা ছয়টা আবু সালেহ ভাই বের হলো, সাতটায় আমি আর ড্রোসী। আমাদের সাথে একে একে ক্যাম্পে প্রায় সকলে যোগ দিল। হোটেলে খাওয়ার এক ফাঁকে ব্রাডলি লিন বললো, তোমরা কি কাজ করো? আমার সোজা উত্তর, তুমি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর ওয়েব সাইট ভিজিট করো। প্রতি উত্তরে বলে ছিলো, ওটা করা শেষ। তুমি তোমার অভিজ্ঞতা বলো। বললাম, খুব খুশি হলো ব্রাডলি। ডিনারের সময় সনদ দেওয়া হলো দু'টো, ঠিক নামটা মনে নেই - এক মেয়ে চারটি কলম দিয়েছিলো আমাকে। ক্যাম্পের সকলের জন্য একটি করে মগ দেওয়া হলো। ডিনার সেরে বের হলাম, কিন্তু জানি না এখন কি কাজ। সবাই এক সঙ্গে হেঁটে চললাম।
তাইপে মেইন স্টেশন, প্রায় সাড়ে দশটা। দেখলাম সুন্দর একটি ঝকঝকে রেল ষ্টেশন। অনেকে বসে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। আমরাও বসে গেলাম গোল হয়ে। যাদের ক্যাম্পের কাজ কিছু বাকি ছিলো তারা কাজ শুরু করলো। আস্তে আস্তে কয়েকজন ঐখানে শুয়ে পড়লো। ভাবছি, মেয়েদের কি স্বাধীনতা। আমার তেমন কোনো কাজ না থাকায় দারদারের সাথে গল্প শুরু হল।
- তোমাদের ওখানে নাকি সন্ধ্যার পরপরই মানুষ ঘরে চলে যায়।
মনে মনে খটকায় পড়লাম। এ কথা কেন?
- তোমাকে কে বলেছে?
- ড. কো, তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেন।
মনে মনে ভাবলে সব দোষ-গুণ মনে হয় বলেছেন। কথা ঘুরিয়ে লাভ হবে না। ওদের কখনও মিথ্যা বা প্যাঁচিয়ে কথা বলতে শুনিনি। তারপরও ভাবছিলাম দেশের ত্রুটি নিয়ে আলোচনা আমার জন্য মোটেই সুখকর হবে না। তারপরও জিজ্ঞাসা করেছে যেহেতু উত্তর তো দিতে হবে।
- হ্যাঁ, সবাই সকাল সকাল ঘরে ফিরে।
- কেন?
- তোমাদের এখানে সবখানে বৈদ্যুতিক আলো থাকে, শহর অঞ্চলে আলো থাকলেও গ্রামে এ ব্যবস্থা নেই। যদিও আমার ইউনিয়নের বেশ কিছু স্থানে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
- শুনেছি, এতে নাকি তোমাদের কিছু সমস্যায় পড়তে হয়।
- হ্যাঁ, তাতো একটু হয়।
- সন্ত্রাস আছি নাকি!
- অন্ধকারে সামান্য কিছু খারাপ লোক আছে যারা ছিনতাই করে।
- মেয়েদের নাকি আরো সমস্যা।
- তাতো, যেহেতু আলো থাকে না, সেহেতু সমস্যা একটু হয়।
এভাবে কথা প্রায় শেষ। আমার জানা ছিল না, কেন আমরা এই ষ্টেশনে আড্ডা দিচ্ছি। কথার শেষ পর্যায়ে দুই জন মেয়ে বিদায় নিলো। বলল, বাবু যাই, হয়তো আবার দেখা হবে যদি আবার ক্যাম্পে আসো। দৌড়ে গিয়ে ট্রেনে উঠলো। এভাবে এক এক করে সব মেয়েরা বিদায় নিচ্ছিলো, আর বুকের ভিতর একটা শূন্যতা কাজ করছিলো। প্রায় নয়টা দিন এক সাথে কাজ করা, এক সাথে খাবার খাওয়া, ঘুম কাতুরে আমাকে কেউ না কেউ ডেকে তুলতো - সব মনে পড়ছে, আর বুকের ভিতর হু হু করে উঠলো।
যেদিন তুষারপাত হলো, তিন ঘন্টা আমি কাজ করতে পারিনি। একটা স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে শুয়ে ছিলাম, চকোই আর একটা ব্যাগ এনে গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিলো। দ্বিতীয় তলায় যেদিন রাতে ভয়ে গোসলে যেতে পারছিলাম না, সেদিন ঐ চকোই বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো - যেন আমি ভয় না পাই। জনশূন্য ফ্লোরে আমাদের কোন মেয়ে মনে হয় না সাহস করে যাবে, কিন্তু চকো গিয়েছিলো। আর এটা তার সমাজ, তার রাষ্ট্র সেই পজিশন করে দিয়েছে - নিজেকে নিরাপদ ভাবার। ধীরে ধীরে এসব কথাও মনে পড়তে লাগলো।
ডিফেন্স কলেজের একটি মেয়ে প্রায় সময় নিরব থাকতো। যার সাথে আমার তেমন কথাই হয় নি। সে বিদায়ের আগে লিখেছিলো, তোমাকে আমার খুব ভাল লেগেছে, বন্ধু। কথা বলতে খুব ইচ্ছা করতো কিন্তু ইংরেজিতে এতো খারাপ যে কথা বলতে পারিনি। তোমাকে সহ ক্যাম্পের সকলকে খুব মিস করবো। এই মেয়েকে নিয়ে আমার ধারণা ছিলো, হয়তো একটু হিংসুটে প্রকৃতির, কিন্তু ধারণা একবারেই ভুল। বিদায় বেলায় সেটা প্রমাণ করে দিয়ে গেল।
শেষে আমরা কয়জন ট্রেনে উঠলাম। উদ্দেশ্য যার যার বাড়ি। তবে, ড্রোসী আমাকে হিরো হাউসে নামিয়ে দিয়ে যাবে। নামার সময় চকো নামলো না। শুধু বিদায় জানালো।
ড্রোসীকে বললাম, চকো কোথায় যায়। বলল, আরো দুই স্টপেজ পরে নামবে। সেখানে রাস্তায় ওর বাইক রাখা, সেই বাইক নিয়ে বাড়ি যাবে। ঘড়ির কাটায় তাইওয়ানে রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারো। জিজ্ঞাসা করে ফেললাম, একা! সাবলীল উত্তর, হ্যাঁ। বলে রাখালে ভাল হবে যে, তাইওয়ানে আমার দেখা সব মটর সাইকেলই একই মডেলের, স্কুটার টাইপের। সবাই একই মডেলের বাইক চালায়, আর দুই রাস্তার মাঝে যে স্থান রাখা, সেখানে সারি সারি বাইক রাখা থাকে, চিন্তা ছাড়াই দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ঐখানে বাইক রাখা থাকে। চকোর বাইকটাও তেমনই ছিলো। রাতে ড্রোসী পৌঁছে দিয়ে গেল হোটেলে আর বলে গেল সকালে আসবে আমাদের এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিতে।
পরের দিন যথা সময়ে ড্রোসী আর এ্যাঞ্জেলা বেবী এসে হাজির। জানি না এ্যাঞ্জেলা বেবীর  প্রকৃত নাম কি। এটা তার ফেসবুকের নাম, তার প্রিয় চায়না শিল্পীর নামে ফেসবুক ব্যবহার করে। দু'জন আমাদের নিয়ে চললো, আমি আর আবু সালেহ ভাই মাঝে মধ্যে আফসোস করছি - তাড়াতাড়ি তাইওয়ান ছেড়ে যেতে হচ্ছে ভেবে। রেল ষ্টেশনে আবার তিন/চার জনের সাথে দেখা, যাদের সাথে এতো দিন ছিলাম। আজ তাদের আরো বেশি প্রাণবন্ত আর উচ্ছ্বল লাগছিলো। শেষ বার আবার বিদায় নিয়ে বাসে উঠলাম। ড্রোসী ও বেবীর সাথে। এয়ারপোর্ট নেমে সার্বক্ষণিক আমাদের সাথে ছিলো ওরা দু'জন। আমাদের দেশে এয়ারপোর্টের মেইন গেটও পার হতে দেয় না, ওরা শেষ চেকের আগ পর্যন্ত সাথে ছিলো। মাঝে ভাইবারে কথা হলো একবার ক্যাম্পের অন্যদের সাথে। শেষ বিদায়ে এ্যাঞ্জেলা বেবী জড়িয়ে ধরাতে একটি জিনিস বুঝলাম, ওরা শুধু কাজ না, মাঝে মধ্যে আবেগকেও প্রশ্রয় দেয়। বিদায় জানিয়ে ভিতরে ঢুকছি আর ভাবছি, আর হয়তো এদের সাথে দেখা হবে না।
টিআইবি'র এই সুযোগটা না পেলে দেখা হতো না। তবে দেখলাম, স্বাধীন, নিরাপদ এক ঝাঁক তরুণীকে। যাদের মতো জীবন এখনো আমাদের সমাজের মেয়েরা চিন্তাও করতে পারে না।
সত্যিই ইয়েস হওয়ায় গর্ববোধ করতেই পারি, শুধু একটি নয় ইয়েস জীবনের অনেক প্রাপ্তি, অনেক গর্বের জায়গা আছে, যা পর্যায়ক্রমে বলবো।

Comments   

 
0 #2 Md. Suruj Khan 2016-11-12 18:03
ভাই, এ স্মৃতি ভোলার না।
Quote
 
 
0 #1 Kazi Abusaleh 2016-08-03 15:26
ভাই, আবেগী বানিয়ে দিলেন। চমৎকার উপস্থাপনা হয়েছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সবাই হৃদয়ের কোঠরে থাকবে।
Quote
 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year