pic_ms_iacd7_16_en.jpg

আব্বু, আপনি-ই আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক

User Rating:  / 1
PoorBest 

একজন নিরাক্ষর দিন মজুরের সন্তান আমি। দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন আমার বাবা। আমি দেখেছি দিন মজুর থেকে ড্রাইভার বাবাকে। যে সারা দিন ভ্যান চালিয়ে চল্লিশ থেকে ষাট টাকা আয় করতেন।
মনে পড়ে প্রথম স্কুলে যাওয়ার কথা। আমার মেজ চাচা প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করে দিয়ে এসেছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যিনিও ছিলেন একজন নিরাক্ষর মানুষ। আমার বাবা আমাকে প্রতিদিন স্কুলে যেতে দুই টাকা করে দিতেন, খরচ বাবদ। ১৯৯৪/১৯৯৫ সালের দিকে একজন দিন মজুরের সংসারে দুই টাকা অনেক বড় ব্যাপার ছিল। শুধু তাই নয়, খুব ভাল করে মনে আছে, দুই টাকার পাশাপাশি একটি দোকান ঠিক করা ছিল - যেখান থেকে আমি খাবার নিবো আর মাস শেষে আব্বু টাকা পরিশোধ করবে। এক টাকায় চার খানা লজেন্স অথবা এক টাকার বুট-বাদামে তুষ্ট হতো মন। দুই টাকা নিজের থেকে যেত। আমি টাকা জমাতাম, আম্মু-আব্বু উৎসাহ দিতেন। তখন বুঝিনি এভাবে সঞ্চয় শেখাচ্ছেন আমার নিরাক্ষর বাবা-মা। ঈদ অথবা কোন কারণে জমানো টাকা দিয়ে আম্মুর শাড়ী/ ব্লাউজ কিনে দিতে পেরে আমি হতাম পৃথিবীর সেরা সুখী মানুষ।
 আব্বু ভোরে চলে যেতেন কাজে, যতদূর মনে পড়ে তখন টু অথবা থ্রীতে পড়ি। সকালে আম্মু ঘুম থেকে তুলে ফ্রেশ করে মক্তবে দিয়ে আসতেন - আরবী শিখতে, এটা ছিল আব্বুর নির্দেশ। আব্বুর কথা, সময় মতো রান্না হওয়ার দরকার নেই, ঠিক সময়ে আমার কোন সেবার দরকার নেই, শুধু আমার ছেলের লেখা-পড়ায় যত্ন চাই। এখন দেখি, আধুনিক মায়েরা সন্তানদের স্কুলে নিয়ে গিয়ে বসে আড্ডা দেয়। আর সেই ১৯৯৪/৯৫ সালে আমার নিরাক্ষর আব্বুর কথায় নিরাক্ষর আম্মু সকালে স্কুলে দিয়ে আসতেন কোলে করে। আসা-যাওয়া আধা ঘন্টা, মাঝে বাড়ি ফিরে ঘরের কাজ সামলাতেন। আবার অন্যের বাড়ি ঘড়ি দেখে ঠিক সময়ে গিয়ে কোলে করে নিয়ে আসতেন। 
একজন ড্রাইভার আর কতই বা আয় করে। মনে পড়ে, একবার বড় হরতাল হয়েছিল। সব কিছুর দাম আগুন। টেম্পু চালানো নিষেধ। আয়-রোজগার ছিল না, কিন্তু আমার চাহিদা কখনও ই অপূর্ণ ছিল না।
ক্লাস ফোরে পড়ার সময় আব্বুর বড় একটি দূর্ঘটনা ঘটলো, প্রায় ছয় মাস অসুস্থ ছিলেন। সুস্থ হয়ে পেশা পরিবর্তন করে ব্যবসা শুরু করেন। সফলতার সাথে ব্যবসা, আমিও বড় হতে থাকি। আমার চাহিদা বৃদ্ধি পেতে থাকে, একরোখা ভাব চলে আসতে শুরু করে। আব্বু চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আমাকে বোঝান কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ। তিনি আমার মহান শিক্ষক। পরিবার থেকে যা শেখা যায়, তা কোন শিক্ষাগুরু বা পুস্তক দিতে পারে।
হঠাৎ ক্লাস নাইনে আব্বু মারা যান। তখনও জানা হয় নি, তার একমাত্র সন্তানকে নিয়ে কি স্বপ্ন ছিলো। আম্মুর কথা ছিলো, মানুষের মতো মানুষ হতে হবে, হয়তো এটাই স্বপ্ন ছিলো আব্বুরও। দেখে যেতে পারেন নি আমার একটাও সাফলতা। অবশ্য আম্মু শুধু দু'টো একাডেমিক সনদ অর্জন দেখে গিয়েছেন।
হুমায়ূন আহমেদের কথায়, "পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ পাবেন কিন্তু একটিও খারাপ বাবা পাওয়া যাবে না।" চরম সত্য কথা। তবে আমি বলবো, আমার বাবা-ই সেরা। যে নিজের সুখ চিন্তা না করে আমাকে বড় অফিসার না, মানুষ বানাতে চেয়েছিলেন। যিনি আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। যার অনুপ্রেরণা আর প্রবল ইচ্ছা আমার অন্তরে ছিলো বলেই আজ আমি প্রথম শ্রেণিতে সবগুলো একাডেমিক সনদ অর্জন করতে পেরেছি।
আব্বু, আপনি শ্রেষ্ঠ আব্বু, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। একটিও শিক্ষিত বাবার দরকার হবে না, আপনার মতো একজন নিরাক্ষর আব্বু থাকলে। যখন আপনি পৃথিবীতে ছিলেন, সেই সময় বাবা দিবস ছিল কিনা জানি না, থাকলে আপনাকে জড়িয়ে ধরে বলতাম, আপনি-ই আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ।
 আমার জীবনে গুটি কয়েক আফসোসের মধ্যে একটি, আপনি আপনার সন্তানকে যা দেখতে চেয়েছিলেন, সে আপনার স্বপ্ন কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে, এটা জানাটা আমার খুব দরকার ছিলো। জানি না, মানুষের মত মানুষ হতে পেরেছি কিনা। তবে এতটুকু অবশ্যই জানি, একজন মানুষের মতো মানুষ - আমার বাবা।

Comments   

 
0 #2 Md. Suruj Khan 2016-06-22 00:53
ধন্যবাদ মোনালিসা আপু
Quote
 
 
0 #1 Dilruba Begum Monalisa 2016-06-19 11:15
এটা শুধু আপনার জিবনে নয়, বাবা এবং মা এ দুজনেই সবার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, এটা জীবনের প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি। লেখাটি পড়ে ভাল লাগল।
Quote
 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year