pic_ms_iacd7_16_en.jpg

মায়ের প্রতি নির্যাতন কেন??

User Rating:  / 5
PoorBest 

সুন্দরবনের পাশে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন নিয়ে কম বিতর্ক হচ্ছে না। অতএব, এই নিয়ে বলার যা কিছু আছে, তা শেষে বলবো। তার আগে কয়েকটি পয়েন্টে কথা বলা প্রয়োজন।
০১. সবার কম-বেশী জানা যে,বাংলাদেশের সরকারী দুর্নীতিগ্রস্থ যে সকল অফিস রয়েছে তার মধ্যে বন বিভাগ অন্যতম। বনজীবীদের কাছ থেকে ঘুষ  নিয়ে তাদের বনে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়। বনজীবীরা সাত দিনের অনুমতি নিয়ে মাসের উপরে বনে কাটায়। বন বিভাগ কিছু বলতে পারে না, কেননা মুখে খেলে চোখে তো লজ্জা করে - এই সুযোগ গ্রহণ করে গোলপাতার পাশাপাশি অন্যান্য গাছের সাথে সুন্দরী গাছও কাটা হয়। ভাগের অংশ ঠিকই যায় বন কর্মকর্তার পকেটে।
যাদের বনের নিরাপত্তার জন্য রাখা হয়েছে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চোরাকারবারীরা কিভাবে হরিণ-বাঘ শিকার ও গাছ কাটছে? বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে মেনে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু এটা তো নিয়মিত ঘটনা। নিরাপত্তা দিতে না পারলে বেতন নিতে সংকোচবোধ করার কথা, কিন্তু সংকোচবোধ তখনই করে না - যখন চোরাকারবারীর কাছ থেকে মাসোয়ারা অথবা ভাগ পাওয়া যায়।
পাশাপাশি নিম্ন পদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে বসদের চাহিদার অন্তঃ থাকে না। এই কাঠের ফার্নিচার, আপনার ভাবীর ড্রেসিং টেবিল পরিবর্তন দরকার, আপনার ভাবীর বোন হরিণের মাংস খাওয়ার বায়না ধরেছে, আমার শালার আবার একটা বাঘের মাথা লাগবে, শাশুড়ী হরিণের চামড়া দিয়ে নামাজের পাটি বানাবে, শ্বশুর ঐতিহ্য ধরে রাখতে হরিণের সিং চাই। বড় কর্তাদের এত এত বায়না মিটাতে ছোট কর্তারা হাত মিলিয়ে নিজেরাও দু' পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে।
আমার দৃষ্টিতে সমাধান হলো, প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের  বিভাগীয় ওয়েব সাইটে তার এবং তাদের নিকটাত্নীয়দের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব প্রতি মাসে আপডেট করবে। নতুন সম্পদ সংযোজিত হলে, অর্জনের উৎস বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করতে হবে, এমন কি একটি চেয়ার ক্রয় করলেও। দুদকের একটি এক্সপার্ট টিম নিয়মিত এ ব্যাপারে মনিটরিং ও তদন্ত অব্যাহত রাখবে। বিচ্যুতি ধরা পড়লে দেউলিয়া করে দিয়ে যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
ট্রেনিং-এর মাধ্যমে বন রক্ষীদের আরো বেশী চৌকস ও পেশাদারী করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে দুর্নীতি বিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে, কেননা প্রতিটি  ধর্মই দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করেছে।
বাওয়াল, মৌয়াল, মৎসজীবীসহ বনের উপর যাদের উপার্জন নির্ভরশীল, তাদের সকলের জন্য অন্য পেশার ব্যবস্থা করতে হবে। যে পেশা হতে পূর্বের তুলনায় একটু হলেও আয়টা বেশী হয়।

০২. সুন্দরবনের ভিতর থেকে নৌযান চলাচল বন্ধ করার জন্য সুপারিশ করা হলেও বন্ধ হয় না। সাময়িক বন্ধ হয়, স্থায়ী বন্ধ হয় না কেন? কে বা কারা এই বনের মধ্যে থেকে নৌযান চালাতে উৎসাহী? কর্তৃপক্ষ কেন যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারছে না? তাহলে কি অদৃশ্য কোন শক্তি এটা নিয়ন্ত্রণ করছে? সেই শক্তি নিশ্চয়-ই সরকারের চেয়ে বড় নয়।
সমাধানের ক্ষেত্রের মনে হয়, শুধুমাত্র সরকারের ইচ্ছাই যথেষ্ট। একটি রুল জারী করবে যে, সুন্দরবনের মধ্য হতে কোন প্রকার জলযান চলবে না। এতে করে মনে হয় না, কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যান চলাচলের দুঃসাহস দেখাবে।
০৩. বনদস্যু বা ডাকাত কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না? এই বনদস্যুরা প্রতি নিয়ত বিভিন্নভাবে বনের ক্ষতি করে থাকে। পশু-পাখি নিধন, গাছ কর্তন, দু' পক্ষ গোলাগুলি করে, পশু-পাখি নিজেদের নিরাপদ মনে করতে না পেরে হয়ত বনের অন্যদিকে (ভারত অংশে) আশ্রয় নেয়। বনদস্যুরা মৎসজীবীদের অপহরণ করবে, প্রশাসন ছাড়াতে ব্যস্ত হবে - বনের ভিতর অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে।
আমাদের রয়েছে চৌকস ও ইন্টেলিজেন্ট বাহিনী - র্যাব। বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয় গঠিত এই বাহিনী  তাদের দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় বহুবার দিয়েছে। বনদস্যূ ও জলদস্যূ দমনে আমরা এই বাহিনীকে কাজে লাগাতে পারি। বিভিন্ন বাহিনীর আরো কিছু চৌকস সদস্যদের এই বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করে তিন/পাঁচ/সাত দিনব্যাপী একটি সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে। এতে করে যেমন সন্ত্রাস দমন সম্ভব হবে, অন্যদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধান করা গেলে এবং বিদেশী পর্যটকদের ভীড় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে।
০৪. কোন কারণে বনে আগুন দেওয়া হচ্ছে? যে বন মায়ের মত দক্ষিণাঞ্চলকে আগলে রাখে, সেই বনে আগুন কেন?
(ক) ব্যক্তিক আক্রোশ হতে এমনটা হতে পারে না, আবার হতেও পারে। একজনকে ফাঁসাতে অন্যজন আগুন লাগাতে পারে।
(খ) রাজনৈতিক তুচ্ছ দ্বন্দ নিয়ে আগুন লাগানো হতে পারে। ঐখানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বন থেকে রাজনৈতিক কোন কোন নেতা কি কি সুবিধা ভোগ করতো তা খতিয়ে দেখা দরকার। সাথে সাথে কোন নেতার স্বার্থহানী হতো কি না তা বিবেচনায় আনতে হবে। মিডিয়া গরম থাকায় শুধু  তিনজনকে গ্রেফতার করে লোক দেখানো ভাব বন্ধ করার পাশাপাশি প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করতে হবে।
(গ) সুন্দরবনের প্রতি অন্য কোন দেশের আক্রোশ আছে কি না সে ব্যাপার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। এমন যদি হয় যে, তাদের কোন এজেন্টের মাধ্যমে কাজটি ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রেখে, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে একাধিক বার আগুন লাগানোর কারণ কি তা অবশ্যই জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিৎ। এই তদন্ত অবশ্যই গ্রহণযোগ্য সংস্থা থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে করতে হবে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও স্বচ্ছতা প্রকাশ পাবে।
০৫. রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে কম বিতর্ক হচ্ছে না। একপক্ষ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করবেই, অন্যপক্ষ যেকোন মূল্যে প্রতিরোধ করবে। এত কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আন্তর্জাতিক কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে এর প্রভাবের উপর গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হোক। ফলাফলের উপর নির্ভর করবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে কি না। বিন্দু মাত্র ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে কোন অবস্থাতেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না, এই ঘোষণা সরকার থেকে আসবে। কেননা আমরা জনগণ - আমাদের ভাল-মন্দ দেখার দায়িত্ব ব্যালট পেপারের মাধ্যমে প্রতিনিধিকে দিয়ে থাকি। অতএব, আমাদের ক্ষতি হোক এমন কোন কাজ সরকার অবশ্যই করবে না। আর গবেষণায় যদি দেখা যায়, কোন ক্ষতি হবে না, তবে অবশ্যই বিদ্যুৎ কেন্দ্র হবে - কোন আন্দোলনের যৌক্তিকতা আছে বলে আমি মনে করি না। গবেষণা করানো এবং জনসম্মুখে তার ফলাফল প্রকাশের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।
পরিশেষে বলি, আমরা দক্ষিণাঞ্চলবাসী। সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো আগলে রাখে। প্রতিটি দুর্যোগ আমরা খুব কাছ থেকে দেখি, যা আরো কয়েক শ' গুণ ক্ষতি করতে পারতো। ক্ষতি হয় না শুধু সুন্দরবনের কারণে। যদি একাট্টা হয়ে জনগণ সুন্দরবন রক্ষার জন্য নামে তো ক্ষমতাধর ব্যক্তিও ক্ষমতাহীন হবে নিমিষে। তাই বলি, মায়ের প্রতি কোন নির্যাতন যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, সুন্দরবনের প্রতিও কোন অন্যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে না - কোন অবস্থায়।

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year