pic_ms_iacd7_16_en.jpg

তারুণ্যের খামখেয়ালীপনা ও একটি প্যারোলে মুক্তি

User Rating:  / 9
PoorBest 

দুপুরের দিকে ঘুমিয়ে আছি, হঠাৎ ফোন - আমার কাছের একটি বন্ধুর বাবা মারা গেছেন। হন্তদন্ত হয়ে ফ্রেশ হয়ে ছুটলাম ওর বাসার দিকে। কিছু দূর যেতে না যেতে আর একটি ফোন, ওর ছোট ভাই সঙ্গদোষে কারাগারে - তাকে প্যারোলে মুক্ত করাতে হবে।
 এমন অভিজ্ঞতা আমার নাই। আঙ্গুল গুণে বলা যায় আমি কত বার থানায় গেছি। নেহাত খুব বিপদে না পড়লে থানা, কোর্টে কেউ যেতে চায় না - আমিও এর ব্যতিক্রম নয়। তারপরও বন্ধুতো আমার, আমি ফোনেই প্যারোলে মুক্তির দরখাস্ত লিখতে বললাম। অফিসে পৌঁছে দরখাস্ত আর আমাদের ঐ বন্ধুটিসহ কয়েকটি বন্ধু ও ছোট ভাইদের নিয়ে ছুটছি জেলা প্রশাসকের অফিসে। হঠাৎ আমাদের সভাপতির সঙ্গে দেখা, তিনি দরখাস্তে অনুরোধ করে একটি নোট লিখে দিলেন। কিন্তু তাঁর সিল লাগাতে অন্য একজনকে ফোন দিলাম। সে এসে সিল মেরে দিল।
 আমরা যেতে যেতে প্রায় সাড়ে পাঁচটা। জেলা প্রশাসক নেই, দায়িত্বে একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হয়তো, ঠিক মনে নেই। সরাসরি তাঁর রুমে প্রবেশ করে দেখি কিছু একটা নিয়ে সভা করছেন। সভা স্থগিত রেখে আমাদের কথা শুনলেন এবং অনুমতি দিয়ে দিলেন। আমরা অবাক হলাম - মোটেই দেরি করালেন না। যেতে যেতে এবং ফোনে অনেক নিরাশাবাদী বৃদ্ধ কন্ঠ আমাদের বলেছিল, "ও হবে না। শুধু শুধু..........."
আমাদের জয়ের আনন্দে শোক কিছুটা হলেও কম লেগেছিল খানিক সময়। না বুঝে-ই ঐ অনুমোদিত আবেদন নিয়ে ছুটলাম জেল গেটে। দারোয়ান বহুত ফিরিস্তি দিয়ে ঢুকলাম, ঢুকে জেলার সঙ্গে দেখা করবো বললাম একজন সিপাহীকে। তিনি বার্তা পৌঁছে দিলেন, কিন্তু তিনি কোন সাড়া দিলেন না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ সরকারী কর্মচারী জনগণকে মালিক না ভৃত্য ভাবতে বেশি পছন্দ করেন, হয়ত দল ভারী করতে তিনিও তাদের দলের একজন। যখন ধৈর্য্য আর মানছিল না, তখন বললাম, তাকে বলেন (সাংগঠনিক পরিচয় দিয়ে) ডিসি স্যারের একটি পত্র নিয়ে এসেছেন। বলতেই তিনি এসে হাজির। উনি কাগজটি দেখে বললেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় আসেন। এটি ঠিক হয়নি। এটি নয়, একটি অনুমতি পত্র জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এখানে এবং এসবি অফিসে পাঠাতে হবে। এটি সেটি বহন করবে অফিসিয়াল লোক, আপনারা না।
আমার আবার ফিরে আসলাম ডিসি'র কার্যালয়ে। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক তখনও অফিসে, তাকে বললাম সব কিছু, তিনি পুনরায় ঐ অনুমতি পত্র লিখে দেওয়ার আদেশ দিলেন। না, তাঁর ভিতর কোন বিরক্তিবোধ বা অনিহা দেখতে পাইনি। সত্যিই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নিয়েছিল, যা এখনও অক্ষুন্ন।
তিনি আদেশ দিলেও করণিক যেন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলেন। তার কাজটায় অনীহা। সে অনুমতি পত্রের ফরমেট পাচ্ছে না। এর মধ্যে লোডশেডিং শুরু হলো। একে তো নাচুনে বুড়ি, তার উপর ঢোলের বাড়ি। একে তো গড়িমসি করছিল আর এখন অজুহাত বিদ্যুৎ নেই, সন্ধ্যা প্রায় ছয়টা বাজে সহ নানান অজুহাত। এই অজুহাতের কারণ আমরা বুঝি, তবে না বোঝার ভান করাটা যুক্তিসঙ্গত। অনুরোধ করলেও পাত্তা দিচ্ছিলেন না। সব কিছু এসএ নাজির লক্ষ্য করছিলেন। তিনি বললেন,
- সব সময় ধান্ধা খোঁজ কেন? আগে মানুষ চেন, নয়তো বিপদে পড়বা।
- ধান্ধা খুঁজি মানে?
- সবাই ঘুষ দেবে না, তারপরও তোমার কাজ করে দিতে হবে।
- আমি ঘুষ চাইছি? তুমি এসে করো।
- ঘুষ চাও নি, তবে ভাবে বলছো....
 এক কথায় দুই কথায় দুইজনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। আমরা শুধু দর্শক না, মিমাংসাকারীর ভূমিকাও অবতীর্ণ হলাম। সব ঠান্ডা হচ্ছে এই পর্যায়ে একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেট আসলেন। তিনি কেরানীকে জিজ্ঞাসা করলেন,
-অর্ডারের কি খবর?
-স্যার খুঁজে পাচ্ছি না।
-খুঁজে পাওয়ার কি আছে, লিখে দেন।
-স্যার, কারেন্ট নেই।
-তাতে কি? হাতে লিখবেন। যখন কম্পিউটার ছিল না, তখন কি লেখা হয় নি? মানুষ বিপদে না পড়লে এমনভাবে এই সময় আসে? দেন, আমি লিখে দিচ্ছি।
ম্যাজিস্ট্রেট নিজ হাতে লিখছেন, বিদ্যুৎ নেই, সুমন মোবাইলোর লাইটের আলো ধরে আছে। জানি না অফিসে মোম/চার্জার লাইট বা জেনারেটরের কোন ব্যবস্থা আছে কিনা। লেখা শেষ করেই বললেন, আপনাদের কাজটা একটু তাড়াতাড়ি করা দরকার। আসামীকে নিয়ে যাবে, লাশ দাফন হবে অনেক কাজ। আমরা দুইজন তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। সে আপন মনে বলে চলেছেন, আমি-ই সার্কেল এসপিকে বলে দিচ্ছি, সে আমার পরিচিত, খুব তাড়াতাড়ি পুলিশ পেয়ে যাবেন।
আমি ভাবছি, এইতো একজন সরকারি কর্মকর্তা। এমন হওয়ার কথা ছিল গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিটি সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তার। কিন্তু তা হয় নি, বেশির ভাগ কর্মচারী-কর্মকর্তারা নিজের প্রভু ভাবতে পছন্দ করেন। তাঁরা জনগণের সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করাটাকে তাদের নৈতিক অধিকার ভাবেন। ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলো, পাকিরা দেশ ত্যাগ করলো কিন্তু আমলাদের মধ্য হতে প্রভুত্ব মনোভাব দূর হলো না। তাই, ব্যতিক্রম কাউকে দেখলে আমাদের মনে হয় সে খুব ভালো আসলে তা নয়।  সে আসলে জ্ঞানী, সে তার যেটা করা উচিৎ সেটাই করেন কিন্তু অন্যরা খারাপ করে বলে সঠিক যিনি করেন তাকে ভালো হয়। আমারও তাকে ভালো মনে হয়েছিল। অনেক কিছু ভাবছিলাম, হঠাৎ তাঁর কড়া কথায় নড়েচড়ে বসলাম। কড়া কথা বলার যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। পিয়নকে আমাদের দেওয়া অনুমোদন পত্রটি জেলার এবং এসবি অফিসে দিতে বলায় তিনি বলেছেন, এসবি অফিস এমন চিঠি গ্রহণ করতে চায় না। ম্যাজিট্রেটের সোজা উত্তর, আপনি চাকরি করেন? নিয়ে আমার কথা বলবেন, আমি তাদের স্যারকে বলছি আর এটাতো আপনার ডিউটি।
পিয়নকে নিয়ে জেলারকে চিঠি দিলাম। সে আমাদের বুদ্ধি দিল, জেল গেটে লাশ নিয়ে আসতে। আমরা রাজি না, আমরা যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে প্যারোলে মুক্তি চাই। মাত্র একটি মামলার আসামী এবং আসামী কিশোর। জেলার সঙ্গে দেখা করে বের হওয়ার সময় গেটে একজন এসআই বলেছিলেন, আমি তিন বছর ঝিনাইদাহ চাকুরি করছি, প্যারোলে মুক্তির আবেদন আসছে কিন্তু অনুমতি পায়নি কেউ। শুধু শুধু ঝামেলা আর কি! আমার সোজা উত্তর, দেখি কি করা যায়। চেষ্টা করতে তো মানা নেই।
সেই পিয়নকে সাথে নিয়ে এসবি অফিসে গেলে পুলিশ আসামীর বর্ণনা শোনে। একজন অফিসার বলে সাতটা থেকে নয়টার অনুমোদন হয়েছে, পুলিশ বের হতে তো দশটা বাজবে। শুনে মাথা কিছুটা গরম হলো বটে কথা বললাম না। ডিসি অফিসের পিয়ন বললো, আপনাদের অফিসারের সাথে আমাদের ম্যাডাম কথা বলেছে। কিন্তু পুলিশটার এমন ভাব যে, তাতে কি হয়েছে। অফিস থেকে বের হয়ে পিয়নকে পুলিশটার নাম জিজ্ঞাসা করি কিন্তু সে কেন জানি বলতে নারাজ। ফোন করি প্রেস ক্লাবের সভাপতিকে, তিনি সব শুনে এক অফিসারের মোবাইল নম্বর দিলেন। ফোন করে নম্বর বন্ধ। ফোন করলাম ম্যাজিট্রেট কে, তাঁর ফোনও বন্ধ। ব্যক্তিগত নম্বর খোলা কিন্তু ওয়েটিং-এ আছেন।
জেল গেটে সাত/আট মিনিট এভাবে কাটতেই এক গাড়ি পুলিশ এসে হাজির। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আরো এক গাড়ি। আসামীকে আনা হলো, বাড়ী গিয়ে শেষ বারের মতো বাবার মুখ দেখলো, জানাজায় শরীক হলো। আমাদের প্রবল ইচ্ছা ও তারুণ্য শক্তির জয় হলো। নিরাশাবাদী বৃদ্ধ কন্ঠগুলো তখন বললো, তোমরা অবশ্য। এর কি দরকার ছিলো? জেল গেটে লাশ নিলেই তো হতো।
আবারও নিরাশা, এরা আলোই কখনও দেখিনি, আশার আলো দেখবে কিভাবে। জয় হবে তারুণ্যের, জয় হবে নৈতিক খামখেয়ালীপনার।

Comments   

 
0 #6 Md. Suruj Khan 2016-10-09 10:28
ধন্যবাদ ভাই, তবে আমি কোনো দলের সাপোর্টার না। শুধুমাত্র দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের কর্মী মাত্র। আপনি যদি যথা স্থানে সঠিক কথাটি বলতে পারেন, অবশ্যই সবাই আপনার কথা শুনবে। যুব সমাজের সবাই যে, দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলকে সাপোর্ট করে তা কিন্তু নয়। #রহমান
Quote
 
 
0 #5 rahman 2016-09-03 17:45
Brother maybe you present government party supporter, DC, police everyone listen to your problem and solved. Bangladesh young generation drowning in darkness, because they support corrupted politicians. Which politicians who have not honestly, no humanity only want power and money. Young generation learning only corruption. If they say kill someone they killing, but they never think it's right or wrong.
Quote
 
 
0 #4 Md. Suruj Khan 2016-07-20 10:01
হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাবো মোরা একসাথে। #সালেহ ভাই
Quote
 
 
0 #3 Kazi Abusaleh 2016-07-20 01:53
লিখাটা সত্যিই খুব উপভোগ করেছি। তারুণ্যের সঠিক ভূমিকার নিশ্চত হলেই জয় আমাদের সুনিশ্চিত।
Quote
 
 
0 #2 Khan 2016-06-09 13:13
আশা করি দেখে যেতে পারবেন, বিশ্বাস রাখুন।
Quote
 
 
-1 #1 Dilruba Begum Monalisa 2016-06-07 10:00
তারুণ্যের জয় হবে, সেটা যেন এ জীবনে দেখে যেতে পারি।
Quote
 

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year