pic_ms_iacd7_16_en.jpg

রেলের বিড়ালের নানান রং

User Rating:  / 5
PoorBest 

রেলের কালো বিড়াল ধরা পড়ার পর রেল নিয়ে দুর্নীতির ধারণা আরো বেশি মজবুত হলেও চাকরি না পাওয়ায় রেলের সহকারী স্টেশন মাষ্টার পদে আবেদন করি। আবেদনের প্রেক্ষিতে লিখিত পরীক্ষার ডাকে সাড়া দিতে অনেক ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। তারপরও যথা সময়ে উপস্থিত হই পরীক্ষার হলে। কী অদ্ভুত ব্যাপার! কোন সিট প্ল্যান নেই, যার যাকে পছন্দ তার কাছে গিয়ে বসে পড়ছে। পরীক্ষা যেমন-ই দেই না কেন, জানলাম হলের বাইরে থেকে উত্তর এসেছে কোন কোন বিশেষ ব্যক্তির নিকট। প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার চেয়ে তথ্য প্রযুক্তির যুগে এটা অতি উত্তম পন্থা। যা আমরা পাবলিক পরীক্ষায় যারা বেডে পরীক্ষা দেয়, তাদের মধ্যেও দেখতে পাই। প্রশ্ন পেয়ে ছবি তুলে ম্যাসেন্জারের মাধ্যমে বাইরে আউট আর ফিরতে ম্যাসেজে উত্তর। কী! চমৎকার ব্যাপার।
পরীক্ষা শেষে সুজন বলল,
-কোন সিট নেই। দাঁড়ানোর টিকিট নিতে হবে।
-মানে, এত পথ দাঁড়িয়ে!
জ্ঞানী স্টাইলে সুজন,
-আরে বলদ, আমরা নামাজের জায়গায় বসে যাবো। এক পুলিশ বুদ্ধি দিছে।
অচেনা সেই পুলিশ মহোদয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় চোখ চকচক করে উঠল। মামুন ভাই ঘোল খাওয়ালেন, সুজন টিকিটের লাইনে ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে বিজয়ের ভঙ্গিতে ফিরে আসলো। দুপুরের খাওয়া শেষে আমরা দোতলায় পেপারর উপর বসে আছি। চারদিকে মানুষের চরম কোলাহল, তাকিয়ে দেখছি আর অপেক্ষা করছি। না, ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষা না, সংগীতার জন্য অপেক্ষা।
সংগীতা রাজশাহী সনাকের ইয়েস সদস্য। খুব মিশুক প্রকৃতির মেয়ে। যথেষ্ট ভাব আমাদের মধ্যে। হঠাৎ ফোন,
-ভাইয়া কই?
-দোতলায়..
-কি করেন?
-পেপারের বিছানায় বসা।
-নামেন, আমরা আসছি।
আমরা! মনে মনে ভাবলাম আমরা মানে। দেখি, এক বান্ধবী নিয়ে সংগীতা হাজির। কুশলাদি বিনিময় করতে করতে ট্রেনের সময় হয়ে গেল। আমরা তিনজন ছুটছি ট্রেন ধরতে, সংগীতা আর টিউলিপ ছুটছে আমাদের বিদায় জানাতে। প্রথম, দ্বিতীয় করে সব কয়টি গেট মিস। তিনজনই ট্রেনে চড়তে ব্যর্থ। হতাশ না হয়ে নেমে পড়লাম প্লাট ফর্ম থেকে নিচে। অপর দিকের গেট হতে বানরের ঝুলতে পারলেও বাঁচি। গত রাত আর এই দিন যে কষ্টে গেল, তাতে এই মুহুর্তে রাজশাহী ছাড়তে চাই।
নিচে নেমে দেখি মানুষের পায়খানায় ছয়লাব। পরিবেশের কোন ক্ষতি হচ্ছে কি না তা ভাববার অবকাশ আমার নেই, তাহলে টয়লেটের বেগ চেপেছে এমন কেউ ভাববে কি করে। বছরের পর বছর এইভাবে চলছে। মানুষ টয়লেট করছে আর তা রেল স্টেশন বা অন্য কোনখানে উন্মুক্ত স্থানে পড়ছে। কর্তৃপক্ষ থোড়াই কেয়ার করে। অন্য দিকে, যেখানে সেখানে মল ত্যাগ না করার বিজ্ঞাপন দিয়ে চলছে সরকার। পাবলিক যেখানে সেখানে না গিয়ে সরকারী ট্রেনের টয়লেট ব্যবহার করছে আর তা যেখানে সেখানে ছড়াচ্ছে।
যতই অন্য দিকে নামি না কেন, তিল ধারণের জায়গা মাত্র নেই। রেল পুলিশ বলছে ওঠা যাবে না। ব্যর্থ অনেকে ট্রেন আটকালে পুলিশি হস্তক্ষেপে ছেড়ে দিতে হয়েছে। সবাই মিলে গেলাম টিকিট কাউন্টারে, টিকিট ফেরত দিতে। বিপত্তি শুরু এখানে, টিকিট ফেরত নিবেও না, টাকাও ফেরত দিবে না। ছোট বেলায় রথের মেলায় খেলা দেখাতো - আইতে পারে তো যাইতে পারে না, দেখার পর বলতো কাউকে বললে তোর ক্ষতি হবে। আসলে দেখাতে মাছ ধরা বোছনো'র (আঞ্চলিক নাম) মধ্যে মাছ ঢুকে আর বের হতে পারছে না। কেননা,  সকলে মিলে একটু জোরে কথা বললেই পুলিশকে ফোন দিল। ঐ দিনে আর কোন ট্রেন খুলনা আসবে না জেনে আমরা সোজা ষ্টেশন মাষ্টারের রুমে গেলাম। পাবলিক সার্ভেন্টদের ব্যবহার অনেকটা মাষ্টারের মতো। আমরা তাদের চাকুরিদাতা, বেতনদাতা সব ভুলে আমাদের সাথে প্রভুত্ব দেখানো শুরু করলো। বেশ লম্বা ডায়ালগ ঝাড়তে শুরু করলে আমরা প্রত্যেকে কম-বেশি প্রতিবাদ শুরু করলে সে বের হয়ে গেল। অন্য একলোক ভদ্রভাবে বোঝাচ্ছিলেন, কম্পিউটারে টিকিট কাটা হলে ব্যাক করার কোন অপশন থাকে না। আমাদের প্রশ্ন, থাকবে না কেন? ব্যাকের অপশন নেই, ট্রেনে ওঠার কায়দা নেই এমন কি আপনাদের ব্যবহার চাড়ালের চেয়েও নিচে।
আবার ষ্টেশন মাষ্টারের প্রবেশ।
-এখনও যান নি।
-উপায় বলে দেন।
-ট্রেনে না উঠতে পারলে স্টেশন মাষ্টার কি করবে?
-অতিরিক্ত টিকিট বেঁচলেন কেন?
-না বেঁচলে তো পাবলিকে ভাংচুর করে।
-বেশি বেঁচলেও তো তাই হবে।
-কি! আমাকে মারবা? সরে যেতে পারবা না, সরকারী কর্মকর্তা, চারিদিকে পুলিশ।
-আপনাকে মারার কথা তো কেউ বলে নি।
এরই মধ্যে একজন ছুটিতে থাকা ম্যাজিস্ট্রেট আসলেন, যিনি জায়গা করতে পারেন নি কোন একটি ট্রেনে। আমরা ভাবলাম শিকে ছিড়ল কিন্তু না। চোরে চোরে যেমন মাস্তুতো ভাই, ঠিক সরকারী কর্মকর্তারাও অপরিচিত হলেও এরা খুড়তুতো ভাই হয়। তার ব্যবস্থা ঠিক হয়ে গেল, কিন্তু আমরা রয়ে গেলাম স্টেশনেই। এর মধ্যে একজন তরুণ অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকের সাথে পরিচয় হয়েছে, তথ্যও দিলাম আমাদের ভোগান্তির। কিছুক্ষণের মধ্যে আরো কিছু সাংবাদিক এসে হাজির, কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলো তারা এখন ঢাকাগামী একটি ট্রেনে আমাদের তুলে দিবে। আব্দুলপুর থেকে রকেট মেইলে ঐ টিকিট দেখালে আমাদের খুলনা পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
সংগীতা আর টিউলিপকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়লাম সেই ট্রেনে। প্রচন্ড ভীড়ে এই শীতেও মানুষের ঘামের গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়। বাজে ফ্লেভার নিতে নিতে ঠাসাঠাসি করে এসে নামলাম আব্দুলপুর। প্রায় ঘন্টা দুই অপেক্ষা করার পর রকেট মেইল আসলো। উঠে পড়লাম আমরা প্রায় পনের/বিশ জন, অন্যরা ছত্র-ভঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। ট্রেনে ভাড়া দিতে হবে, কর্তৃপক্ষ এসে হাজির। এটা বেসরকারী ট্রেন, ভাড়া দিতেই হবে। তাদের বোঝানোর পর ভাড়া কম নিতে রাজি হলো।
রেলের চাকরিতে যেমন কালো বিড়ালের উৎপাত, রেলের বিভিন্ন ক্ষেত্রেও তেমন বিভিন্ন রং এর বিড়ালের দেখা মেলে।

Add comment

Only the commentator have the whole liability for any comment.


Security code
Refresh

Posts by Year