• header_en
  • header_bn

‘বদি আলম’দের বিদায়

দেশের সব কাস্টম হাউস থেকে ‘বদি আলম’দের বিদায় করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ‘বদি আলম’রা আর কাস্টম হাউসে প্রবেশ করতে পারবেন না। এর ফলে আমদানি-রপ্তানিকারকের প্রতিনিধিরা ‘বদি আলম’দের সহায়তা ছাড়াই শুল্কায়ন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। এতে সময় বাঁচবে, খরচও কমবে।
গত সপ্তাহে দেশের বৃহত্তম চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে ১৪২ জন বদি আলমকে বিদায় করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কমলাপুর আইসিডি থেকেও চলে গেছেন তাঁরা।
এর আগে গত ৬ আগস্ট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বোর্ডসভায় দেশের সব কাস্টম হাউস থেকে বদি আলমদের বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই সংশ্লিষ্ট সব কাস্টমকে এই নির্দেশ পাঠিয়ে দেয় এনবিআর। এই নির্দেশের পর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও রাজধানীর কমলাপুর আইসিডি থেকে বদি আলমদের বিদায় করে দেওয়া হলো। এ ছাড়া ঢাকা কাস্টম হাউস ও বেনাপোল কাস্টম থেকেও তাঁদের বিদায় করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
কাস্টম হাউসে দালালশ্রেণির কিছু লোক থাকেন, তাঁদের বদি আলম নামে ডাকা হয়। আর কাস্টম হাউসগুলোতে ঘুষ ছাড়া আমদানি-রপ্তানির ফাইল নড়ত না বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ফাইল নাড়াতে বা ত্বরান্বিত করতে বদি আলমদের সহায়তা নেন ব্যবসায়ীরা। এ জন্য ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ করতে হয়। এঁরা ‘ফালতু’ নামেও পরিচিত। এঁরা শুল্ক বিভাগের নিয়োগ করা কোনো কর্মচারী নন। অভিযোগ রয়েছে, শুল্ক কর্মকর্তাদের একাংশ নিজেরা সরাসরি ঘুষের অর্থ না নিয়ে এসব বদি আলম বা ফালতুদের মাধ্যমে নেয়। তাই শুল্ক বিভাগের লোকজনই অনানুষ্ঠানিকভাবে বদি আলম নিয়োগ দিতেন। তাঁরা (বদি আলম) রাজনৈতিকভাবেও প্রভাবশালী বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, শুল্কায়ন-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে একটি আমদানি নথিতে ১১ থেকে ১৬টি সই দরকার হয়। এসব সই ত্বরান্বিত করার নামে বদি আলমরা দালালের ভূমিকা পালন করেন।
যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মাসুদ সাদিক প্রথম আলোকে জানান, গত সপ্তাহেই এসব বহিরাগত ব্যক্তিকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন কাস্টম হাউসের কর্মচারীরা বাড়তি সময় কার্যালয়ে থেকে শুল্ক নথিগুলো হালনাগাদ করে যাচ্ছেন। এত দিন ধরে এই ব্যবস্থা চালু থাকায় সাময়িক কিছু অসুবিধা হলেও শিগগিরই তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
রাজধানীর কমলাপুর আইসিডিতে ১৫-২০ জন বদি আলম ছিলেন। সম্প্রতি তাঁদেরও বিদায় করে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এনবিআরের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের উপদেষ্টা মনজুর আহমেদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি ভালো উদ্যোগ। কাস্টম হাউসগুলোতে কাজের গতি পাবে। এসব ফালতুরা নথি জিম্মি করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা নেন। যেহেতু এখন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছি, তাই তাঁদের বাদ দিতেই হবে।’
গত জুলাই মাসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টম হাউস নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ৬০ থেকে ৭০ জন বদি আলম বা ফালতু রয়েছেন, যাঁরা নিয়মবহির্ভূত লেনদেনে ব্যবসায়ী ও শুল্ক কর্মকর্তাদের সহায়তা করে থাকেন। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, এসব বদি আলমই শুল্কায়নের বিভিন্ন
পর্যায়ে নিয়মবহির্ভূত লেনদেনে সমঝোতা করে থাকেন। শুল্ক কর্মকর্তাদের কার্যক্রম এসব ফালতুদের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড ফালতুদের জানা থাকায় তা অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
টিআইবির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪৭ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। আমদানি পর্যায়ে দৈনিক ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা। একইভাবে রপ্তানি প্রক্রিয়ায় দৈনিক ১১ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়।
২০০৭ সালে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে বদি আলম বা ফালতুদের বের করা দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তাঁদের ওপর কর্মকর্তাদের নির্ভরশীলতার কারণে পুনর্বহাল করা হয়।

 

২/৯/১৪ তারিখে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত। লিঙ্ক